সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯, ২৬ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

সারা বাংলার খবর

মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ

উপকুলের ৩লাখ জেলে পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা

বরিশাল বুরো | প্রকাশের সময় : ১৯ মে, ২০২২, ১১:৩১ এএম

 

সামুদ্রিক এলাকায় বিপন্ন মাছের অস্তিত্ব রক্ষা সহ মৎস্য সম্পদ সমৃদ্ধ করণে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হচ্ছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাতক্ষিরা থেকে দক্ষিণের কুয়াকাটা হয়ে পূর্ব-দক্ষিণের টেকনাফ পর্যন্ত ৭১০ কিলোমিটার উপক’লীয় তটরেখা এবং সমুদ্র অভ্যন্তরের ২শ নটিক্যল মাইল পর্যন্ত ‘একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা’র ১ লাখ ৪০ হজার ৮৬০ বর্গ কিলোমিটারে ছোট-বড় নানা প্রকারের ৪৭৫ প্রজতির মৎস্য সম্পদ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখছে। সমুদ্র এলাকায় ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া, ৫ প্রজাতির কচ্ছপ ও ১৩ প্রজাতির প্রবাল সহ বিভিন্ন জলজ সম্পদ আমাদের সমুদ্র সম্পদকে সমৃদ্ধ করেছে।

সমুদ্র এলাকায় ৬৫ দিন মৎস্য আহরনে নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে নৌ বাহিনী, কোষ্ট গার্ড ও র‌্যাব ছাড়াও নৌ পুলিশ’কে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলেছে সরকার। এলক্ষ্যে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনাতে ইতোমধ্যে সব বাহিনীর পাশাপাশি জেলে, মৎস্যজীবী ও গনমাধ্যম কর্মীদের নিয়ে সভা-সেমিনারে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
দেশের মৎস্য সম্পদে সামুদ্রিক মাছের অবদান প্রায় ১৫%। সমুদ্র এলাকায় প্রায় ৫.১৬ লাখ জেলে ২৫৫টি বানিজ্যিক ট্রলার ছাড়াও প্রায় ৩৩ হাজার ইঞ্জিন চালিত ও ৩৫ হাজার ইঞ্জিন বিহীন নৌকায় নানা সরঞ্জামের সাহায্যে মৎস্য আহরন করে থাকেন। মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, দেশে বছরে উৎপাদিত প্রায় ৪৫ লাখ টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে এককভাবে সামুদ্রিক মাছের পরিমান প্রায় ৭ লাখ টন। সরকার চিংড়ির প্রজনন প্রক্রিয়া নিরাপদ ও নিশ্চিত করা সহ অন্যান্য মাছের বিচরন, প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আহরন প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে, ২০১৫ সালে শুধুমাত্র বানিজ্যিক ট্রলারের ক্ষেত্রে এবং ২০১৯ সাল থেকে সব ধরনের নৌযানের জন্য বঙ্গাপসাগরে নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মৎস্য আহরন নিষিদ্ধ করে। সামুদ্রিক জলাশয়ে ৬৫ দিনের এ আহরন নিষেধাজ্ঞার কারণে গত কয়েক বছরে আমাদের মৎস্য সম্পদে প্রায় দেড় লাখ টন মাছ যোগ হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, ৬৫ দিনের বন্ধ মৌসুম কার্যকরের আগে অর্থাৎ ২০১২-১৩ থেকে ’১৪-১৫ সময়ের তুলনায় ২০১৫-১৬ থেকে ’১৭-১৮ পর্যন্ত বানিজ্যিক ট্রলার থেকে আহরিত মাছের ক্যাচলগ পর্যালোচনায় মৎস্য আহরনের পরিমান বৃদ্ধির সুস্পষ্ট প্রবনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দেশে উৎপাদিত ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টন মাছের মধ্যে সামুদ্রিক জলাশয়ে উৎপাদন ছিল প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টন। যা গত অর্থ বছরে ৬.৮০ লাখ টনের ওপরে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষনে বঙ্গোপসাগরে আমাদের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে মলাস্ক বা শামুক ও ঝিনুকের প্রজাতির সংখ্যা ৩০১ টি, অস্থিময় মাছ ৪৭৫টি, হাঙ্গর ও স্কেট সহ তরুনস্থিময় মাছের প্রজাতি ৫১টি, চিংড়ি ৩৬টি, লবস্টার ৮টি, কাঁকড়া ১৫টি, ডলফিন বা তিমি ১১টি, সামুদিক কচ্ছপ ৫টি, সাপ ৪টি, সাপ ৯৮টি সেপালোপেড ৭টি, স্টার ফিস ৩টি, ওয়েস্টার ৬টি সজারু ১টি, সাগর শশা ১টি এবং ১৬৮ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির প্রবাল ও ৩ প্রজাতির স্পঞ্জ রয়েছে।
কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে অনিয়ন্ত্রিত ও অতি আহরনের ফলে সাগরে ফলি, চান্দা, সার্ডিন বা চাপিলা, বস্তার পোয়া নিঃশেষ হবার পথে। লক্ষা মাছও অতিরিক্ত আহরনে প্রায় নিঃশেষ। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, এ অবস্থায় যেকোন মাছ বানিজ্যিক ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবার প্রবল ঝুকি থাকে। কার্যকর সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহন না করলে এসব প্রজাতির মাছ সম্পূর্ণ বিলুপ্তির আশংকা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে রূপচাঁদা, কলম্বো, মরিচ এবং সাদা পোয়া মাছ এখনো সহনীয় আহরনে তার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গোপসাগরে আমাদের নিজস্ব অথনৈতিক অঞ্চলে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় অবিলম্বে আহরনে নিয়োজিত নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি রহিত সহ তা কমিয়ে আনা জরুরী। ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োগ এবং তার সুফল ধরে রাখতে বেশ কিছু বছর ধরে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা সহ সুফল পেতে সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভেদি ব্যবস্থাসমুহ গ্রহন করার কথা বলেছেন মৎস্য বিজ্ঞানীগন। আর এ লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপটি হবে কঠোর, ফলে সুফলও হবে দীর্ঘ মেয়াদী।
তবে বঙ্গোপাসাগরে ৬৫ দিনের এ আহরন নিষিদ্ধের বিষয়টিকে উপক’লের জেলে ও মৎস্যজীবীদের অনেকেই ভালভাবে না নিলেও নিষিদ্ধকালীন এ সময়ে প্রথম দফায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৩ জন জেলেকে ৫৬ কেজি করে ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৩ জন জেলেকে ৩০ কেজি করে সর্বমোট প্রায় ১২ হাজার ৬১৯ টন চাল বিতরন করবে সরকার।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বিভিন্ন বৈশিষ্ট ও বৈচিত্রপূর্ণ মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ বঙ্গোপসাগর বিশ্বের একমাত্র উপসাগর যেখানে সবচেয়ে বেশী নদী বিধৌত পানি প্রবাহিত হয়। কিন্তু সম্প্রতিককালে বিশ^ব্যাপী ‘সামুদ্রিক ও উপক’লীয় মৎস্য সম্পদ অতি আহরন, ভ’মি ও সমুদ্র হতে সৃষ্ট দুষণ এবং জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন সহ নানামুখি সংকটের সম্মুখিন’। ফলে বাংলাদেশ সহ বিশে^র মৎস্যকুলের প্রাচুর্য, বিস্তৃতি ও প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে মৎস্য সম্পদের টেকসই উন্নয়নের সাময়িক এ নিষেধাজ্ঞার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র।
বিশে^র সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ অসীম হলেও অফুরন্ত নয়। তাই সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সকল ঝুকি ও অনিশ্চয়তাকে বিবেচনায় রেখে বিগত বছরগুলোতে আহরন বৃদ্ধি পেলেও প্রজাতির গুনগতমান অবনমন লক্ষ্য করছেন বিজ্ঞানীগন। এরফলে মৎস্য সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্নস্তরের অংশীজনের মাছের সিমিত সম্পদ নিয়ে অসম প্রতিযোগীতা এবং আয় বৈষম্যও বাড়ছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীগন ‘বিশাল এলাকার জলরাশির মৎস্য সম্পদ সংরক্ষন, ব্যবস্থাপনা এবং সুষ্ঠু ও বিজ্ঞানসম্মত সহনশীল আহরন নিশ্চিত করে বছরের পর বছর সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন অব্যাহত এবং বংশ বৃদ্ধি সহ মজুদ অক্ষুন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব’ দিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীগন ‘আমাদের একান্ত বাস্তবতা ও পরিবেশকে বিবেচনায় নিয়ে সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা নীতি ও কৌশল প্রণয়নে’ তাগিদ দিয়েছেন।
এমনকি সাগরে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাছাধরা নিষিদ্ধের সময়কালের অধিকাংশই ঝড়ঝঞ্ঝা সহ দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় অতিবাহিত হবে। তবে, উপক’লের বিশাল জেলে ও মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, ‘বাংলদেশের সমুদ্র এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও এসময়ে ভারতে নিষিদ্ধ না থাকায় সে দেশের জেলেরা অবাধে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় প্রবেস করে মাছ লুটে নেয়’। তবে মৎস্য বিজ্ঞানীগন এক্ষেত্রে ‘প্রতিবেশী দেশের সাথে সমতা রেখে সাগরে মৎস্য আহরন নিষিদ্ধ ঘোষনার সময় পুণঃ বিবেচনার’ বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় ১৫ এপ্রিল থেকে ৪৫ দিন মৎস্য আহরনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে মিয়ানমার সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জুন থেকে আগষ্ট পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ।
এসব বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক(সামুদ্রিক) ড. মোঃ শরিফ জানান, ‘৬৫ দিন মাছধরা বন্ধ রাখায় সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের কার্যকরি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুফল পাচ্ছে দেশ। চীন সহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতিতেই সাগরের মৎস্য সম্পদের সংরক্ষন ও সম্প্রসারন বাস্তবায়ন হচ্ছে বলেও জানান তিন। ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশের সাথে সমন্বিতভাবে সাগরে আহরন নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারনের বিষয়ে সরকারের মাধ্যমে পদক্ষেপ গ্রহন করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps