শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

সম্পাদকীয়

রাজনীতি কি সংঘাতের পথেই যাচ্ছে?

মোহাম্মদ আবু নোমান | প্রকাশের সময় : ৭ অক্টোবর, ২০২২, ১২:১৪ এএম

গত দেড় মাসে বিএনপির কর্মসূচিতে ভোলায় নূরে আলম, আব্দুর রহিম, নারায়ণগঞ্জে শাওন, মুন্সিগঞ্জে শহিদুল ইসলাম ও যশোরে আব্দুল আলিম নিহত হয়। এদের মধ্যে পুলিশ চারজনকে গুলি করে এবং একজনকে আওয়ামী নেতারা হত্যা করে বলে অভিযোগ। মামলা গ্রেপ্তারও অব্যাহত। সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়ে রড, দা, চাপাতি, হকিস্টিক, লাঠি দিয়ে ছাত্রদলের নেতাদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায়।

যে আওয়ামী লীগ মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে তুমুল ও দুর্বার আন্দোলন-সংগ্রাম করে ভোটের অধিকার হরণকারী শাসকদের তটস্থ করে রাখতো, সেই তারাই আজ ভীত-সন্ত্রস্ত! অথচ এমনটা হওয়ার কথা নয়। একটি পুরনো রাজনৈতিক দল জনরায়কে ভয় পেতে পারে না। মিটিংয়ের জবাব হামলা চালিয়ে মিটিং পÐ করা নয়; বরং তাদের চেয়েও বড় সমাবেশ করে দেখিয়ে দেয়া, তোমাদের চেয়ে আমাদের জনসমর্থন কম নয়। পুলিশের ছত্রছায়ায় বিরোধী দলকে মিটিং করতে না দেয়ার মধ্যে সরকারি দলের কোনো বাহাদুরি নেই। আওয়ামীলীগের এই অসহায়ত্ব সত্যিই অবাক করার মতো।

বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচি এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কয়েক ঘণ্টা আগে মাঠ দখলে নেয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি স্থানেই বিএনপির কর্মসূচিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ তথা ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা হাতে ওই এলাকায় মিছিল ও মহড়া দিয়ে থাকে। কোথাও কোথাও সমাবেশস্থল থেকে নেতা-কর্মীদের হটিয়ে বিএনপির প্ল্যাকার্ডে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

গত ১৪ বছর যারা দেশ শাসন করছে, তাদের কেন ক্ষমতা ধরে রাখতে কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে হবে? আওয়ামী লীগ দেশের যে উন্নয়ন করেছে সেগুলো নিয়ে সর্বসাধারণের কাছে যেতে পারে। দেশে অনেকগুলো মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন, করোনা মোকাবেলায় সফলতা, অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থায়, খাদ্য উৎপাদনে, কর্মসংস্থানে উল্লেখ করার মতো অগ্রগতি, আইটি সেক্টরে বলতে গেলে বিপ্লব ঘটিয়ে সারাবিশ্বের সাথে নিবিড় ও সহজ যোগাযোগ স্থাপন বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, প্রতিবন্ধীভাতা, শিক্ষাভাতা, মুক্তিযোদ্ধাভাতাসহ বেশকিছু ভাতার প্রবর্তন ও বৃদ্ধি সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তিকরণ, এরকম উল্লেখ করার মতো বহু বিষয় রয়েছে। সত্য কথা-আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তাÐব, নৈরাজ্য কমাতে পারলে আওয়ামীলীগ জনগণের আরো কাছে যেতে পারতো। বর্তমানে শুধু বিএনপির কঠিন সময় নয়। কঠিন সময় যাচ্ছে একটা রাষ্ট্রের। ১৮ বছরের অনেক যুবক, যারা কি না গত চৌদ্দ বছরে ভোট দেয়ার অধিকার পায়নি।

একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাধিকার আদায়ের জন্য কেনই বা আন্দোলন করতে হবে? বাংলাদেশের ইতিহাসই হলো- (১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৯০) গণ-আন্দোলনে জয়ী না হয়ে কেউ সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ী হয়নি। দেশের জন্য দুর্ভাগ্য, আন্দোলনে রক্ত ঝরিয়ে ও নিহত না হয়ে জনগণ ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়নি। ভোটের নামে নাটকের অভিনয়’ এখন পর্যন্ত সব দলই করেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা প্রায়ই দেখা গেছে, যার মূল কারণ, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না থাকা। সেবার নামে জনগণকে জিম্মি করাই যেন বর্তমান রাজনীতির মূল লক্ষ্য। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে রাজনীতিতে কখনোই স্থিতিশীলতা আসবে না। এ দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে মানুষ শঙ্কিত। এক দল চায় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে, আরেক দল চায় যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় আসতে। আজকে আওয়ামী লীগ সবাইকে শিখিয়ে দিয়ে গেলে কিভাবে বিরোধী দমন করে বহুদিন আরামে গদিতে বসে থাকা যায়।

নির্বাচন কমিশন বা সরকার মুখে যতই বলুক সামনের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, মাঠের চিত্র কিন্তু ভিন্ন। নির্বাচনের নামে দেশে পেশি শক্তি পরীক্ষার মহড়া সবে শুরু। নির্বাচন মানে এ দেশে বাঁচা-মরার লড়াই। তাই যেকোনো উপায়ে জিততে ন্যূনতম কোনো দ্বিধা নেই কারো। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে আবার যদি নির্বাচন নিয়ে নতুন করে কোনো সংকট তৈরী হয়, তাহলে তা সামাল দেওয়াটা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। অসহ্য পন্যমূল্যে, শহরে, গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-মাঠে মানুষের মনে শান্তি নেই। এমতাবস্থায় নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি সংকটের ভার বহন করার ক্ষমতা দেশের নেই। সাধারণ মানুষ শান্তি চায়। রাস্তাঘাটে নিরাপদে চলতে-ফিরতে চাই। যে কোনো দলের রাজনৈতিক সমাবেশ যেন মানুষের জনদুভোর্গ বা মৃত্যু ফাঁদ তৈরি!

এখন সারাদেশে যা ঘটছে, তা প্রায় অভাবনীয়। বিএনপির সমাবেশ বা মিছিলেই শুধু যে হামলা হয়েছে, তাই নয়, নেতাদের বাড়িঘরে, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে। আটকের সংখ্যা হিসাবের উপায় নেই। এসব হামলায় পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত আছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো এসে দুই দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে রাজনৈতিক সমঝোতা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সমঝোতা হয়নি। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য আহŸান জানিয়েছিলেন। বিএনপির নেতারা সেই আহŸানে সাড়া না দিয়ে, নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দেয়। তখন শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারে ভাগাভাগি, এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদও বিএনপিকে দিতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বিএনপি সে রকম কোনো সুবিধা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচন করে মাত্র সাতটি আসন পায়। ২০১৮ সালের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে গেলে বিএনপি আবারও হাসির পাত্রে পরিণত হবে। অথবা বিএনপি নির্বাচনে গেল না, কিন্তু আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন করে ফেলল, এ ক্ষেত্রেও বিএনপি বিপাকে পড়বে। আওয়ামীলীগ ও তীব্র সমলোচনার শিকার হবে দেশে বিদেশে।

যখই দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীলতায় নিপতিত হয় তখন অনাহারে, অর্ধাহারে থাকতে হয় খেটে খাওয়া মানুষেরই। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। বর্তমানে দেশে বিভেদ, অনৈক্য, মতভেদের যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তার কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাস। এই অনাস্থা, অবিশ্বাস অনেক দিন ধরেই চলছে। এত দিনে এর অবসান হওয়া উচিত ছিল।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন