ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

নিবন্ধ

রোজা ফরজ হওয়ার রহস্য

| প্রকাশের সময় : ৯ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

কে. এস সিদ্দিকী
বিজয়ের মাস মাহে রমজান। অসত্যের বিরুদ্ধে, বাতিলের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বদর যুদ্ধ। মানুষের প্রধান দুশমন শয়তানের বিরুদ্ধে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে শয়তানকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের নাম রমজানুল মোবারক। বড় বড় শয়তানকে এই মাসে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয় বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। রমজানের রোজার নিকট শয়তানের কুমন্ত্রণা, প্রতারণা ব্যর্থ হয়ে যায়। রোজাদারের কাছে শয়তানের এই পরাজয় প্রকারান্তরে রোজাদারের বিজয় বলে গণ্য হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে বাতিল, অসত্যের বিরুদ্ধে হক ও সত্যের লড়াইয়ে জয়লাভ করার অনুপ্রেরণাও রয়েছে এই বিজয়ের মাসের রোজা পালনে। একদিকে শয়তানকে পরাস্ত করা এবং সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার এক মহান যুগান্তকারী শিক্ষা নিহিত রয়েছে এই রমজান মাসে। রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে কাফের কোরেশদের সাথে প্রথম বড় ধরনের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম প্রমাণ করে দেন যে, কেবল শয়তান নয় সর্বপ্রকারের শত্রæর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করাও রমজানের অন্যতম শিক্ষা। এই মহান লক্ষ্যে প্রয়োজনে রোজা ভঙ্গ করার অনুমতিও রয়েছে। এ কারণে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক মওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র.) ‘বাহরুর রায়েক’ নামক সুপ্রসিদ্ধ ফতোয়া গ্রন্থের বরাত দিয়ে তাঁর ‘মেফতাহুল জান্নাত’ পুস্তকে উল্লেখ করেছেন, গাজী (যোদ্ধা) যখন রমজান মাসে শত্রæর মোকাবিলায় লিপ্ত হবে এবং যদি তার আশংকা হয় যে, রোজা তাকে দুর্বল করে ফেলবে, তখন তার জন্য ইফতার করা অর্থাৎ রোজা না রাখাই উত্তম। কেননা, দুর্বলতার কারণে দীনের মধ্যে যে ত্রæটি দেখা দেবে কাফেরদেরকে হত্যার মাধ্যমে তার অবসান ঘটবে। আর ঐ ত্রæটির বিনিময় সেই সময় ব্যতীত সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে রোজা ভঙ্গ করার ফলে রমজানের রোজায় যে ত্রæটি ঘটবে তার বদলা অন্য দিনগুলোতে সম্ভব হবে। অর্থাৎ পরে রোজা কাজা করা যাবে। সুতরাং যুদ্ধাবস্থায় (সত্যের জন্য) রোজা ভঙ্গ করাই উত্তম।
বদর যুদ্ধসহ বিভিন্ন যুদ্ধ রমজান মাসে সংঘটিত হওয়ার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরেও মুসলমানগণ যুগে যুগে শত্রæর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে রমজান মাসের জেহাদী চেতনার আদর্শ সমুন্নত রেখেছেন। তাই দেখা যায়, মদীনা হতে প্রায় ষাট মাইল পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত বদর নামক স্থানে গিয়ে মুসলমানগণ ইসলামের ২য় রমজানে রোজা পালনরত অবস্থায় আক্রমণকারী কাফেদের বিরুদ্ধে প্রথম তুমুল যুদ্ধে মুখোমুখি হন এবং সত্তর জন নেতৃস্থানীয় কাফেরকে জাহান্নামে পৌঁছিয়ে আরও সত্তর জনকে বন্দি করত তাদের কাছ থেকে বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনেন। প্রায় সশস্ত্র এক হাজার কাফের বাহিনীর মোকাবিলায় মাত্র তিনশ তেরজন জান নেসার সাহাবাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স.) সহ সকলে রমজানের রোজা পালনরত অবস্থায় মদীনা হতে বহু দূরে অবস্থিত বদরের যুদ্ধে যে অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে বিজয়লাভ করেন, তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। রমজান মাসের এই যুদ্ধে আল্লাহতায়ালা কীভাবে মুসলমানদের সাহায্য করেছিলেন, কোরআনে তার বিবরণ রয়েছে। এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা সূরা আল ইমরানের ১২৩ নং আয়াতে ঘোষণা করেন, ‘বস্তুত আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল।’ এটি ছিল ইসলামের সর্বপ্রথম প্রকাশ্য বিজয়। এ সত্যটি প্রফেসর হিট্টিও ‘আরব জাতির ইতিহাস’ গ্রন্থে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। কেননা, শত্রæ সৈন্য ও মুসলিম বাহিনীর মধ্যে কোনো তুলনা ছিল না। বিশ্বস্ত বর্ণনা অনুযায়ী ৩১৩ জন সাহাবীর সঙ্গে অশ্ব ছিল মাত্র ২টি এবং উট ৭০টি। সৈন্যরা পালাক্রমে এগুলোর ওপর সওয়ার হয়ে যুদ্ধ করতেন। অপরদিকে শত্রæ বাহিনীর সংখ্যা এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র ছিল বিপুল। মুসলমানদের প্রকাশ্যে মহাবিজয়ের এই যুদ্ধ যাকে কোরআনে ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ বলা হয়েছে। হিজরী দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ শুক্রবার সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে আল্লাহ তা’আলা তাঁর ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছিলেন বলেও কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। এক হাজার, তিন হাজার ও পাঁচ হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। সংখ্যার বিভিন্নতার ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, রমজানের দ্বিতীয় দশকে সংঘটিত বদর যুদ্ধে মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার এই আসমানী সাহায্য ছিল এক বিস্ময়কর, অলৌকিক ঘটনা। এভাবে প্রথম যুদ্ধকে রমজানের সাথে সম্পৃক্ত করে এই সংযম সাধনা ও আত্মশুদ্ধির মাসকে বিজয়ের মাস হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছেন যাতে মুসলমানগণ চিরকাল অন্যায়, অবিচার, জুলুম-নির্যাতন তথা অসত্য ও বাতিলের বিরুদ্ধে রমজানের রোজা অবস্থায়ও প্রতিবাদমুখর ও সোচ্চার কণ্ঠ হয়ে ওঠে।
রমজান মাসে রোজা কেন ফরজ করা হয়েছে, অন্য কোন মাসকে রোজার জন্য কেন নির্বাচিত করা হয়নি? এরূপ প্রশ্ন অনেকের মনে দেখা দিতে পারে। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলবী (র.) এরূপ প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘অপর কোন মাসই যদি নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য ছিল তাহলে এই মাস অপেক্ষা উত্তম আর কোনো মাস ছিল না, যাতে কোরআন মজীদ অবতীর্ণ হয়। তাছাড়া শবে-কদর হওয়ার সম্ভাবনা এই মাসেই অধিক।’ কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘রমজান মাস যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।’ এই মাসে কোরআন নাজিল হওয়ার কারণে এই মাসের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য বহু গুণে বেড়ে যায়। ইসলামের অন্যতম রোকন রমজান মাসের রোজা ফরজ করার জন্য এর চেয়ে উত্তম মাস আর কি হতে পারে। সূরা কদর অবতীর্ণ করে আল্লাহতায়ালা শবে-কদরের যে মহিমা বর্ণনা করেছেন তা সর্বসম্মতভাবে রমজান মাসেই পড়ে। এই শবে-কদর পাওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে রমজানের শেষ দশকে এতেকাফের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার ইচ্ছা সে এতেকাফ পালনের মাধ্যমে শবে-কদর পাওয়াকে নিশ্চিত করতে পারে। এ তিনটি প্রধান বিষয়ের আলোকে রমজান মাসকেই সিয়াম পালনের জন্য আল্লাহতায়ালা নির্ধারণ করে মুমিন মুসলমানদের জন্য অপরিসীম উপকার সাধন করেছেন। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী (র.)-এর বক্তব্যের তাৎপর্য এখানে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের সকল দ্বার খুলে যায় এবং জাহান্নামের সকল দ্বার বন্ধ করে দেয়া হয়।  হযরত সহল ইবনে সা’দ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, জান্নাতের একটি প্রবেশ দ্বারে কেবল রোজাদারগণকে ডাকা হবে। যে রোজাদার হবে সে-ই এতে প্রবেশ করবে। আর যে এতে প্রবেশ করবে সে কখনও পিপাসাতুর হবে না।
আল্লাহ তা’আলা রোজার জন্য রমজান মাসকে নির্ধারণ করেছেন এবং উভয়কে একে অপরের জন্য অবিচ্ছেদ্য বলে গণ্য করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই দুই ররকত ও সৌভাগ্যের সমাবেশ বিরাট রহস্য ও গুরুত্ব বহন করে। আর এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, রমজানই সেই মাস যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং মানুষ সঠিক পথের সন্ধান লাভ করেছে।
রমজানের রোজা ও কোরআনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ও বিশেষ যোগসূত্র বিদ্যমান এবং এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে অন্য সময়ের তুলনায় কোরআন অধিক তেলাওয়াত করতেন। এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এমনিতে অধিক দানশীল ছিলেন কিন্তু রমজান মাসে যখন হযরত জিবরাইল (আ.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন, সে সময় তাঁর বদান্যতা আরও বেড়ে যেত। হযরত জিবরাইল (আ.) রমজানের প্রত্যেক রাতেই হুজুর (সা.)-এর খেদমতে আগমন করতেন এবং তাঁর কাছে কুরআন শ্রবণ করতেন। ঐ সময় হযরত জিবরাইল (আ.) যখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন তখন তাকে দানশীলতা ও নেক কাজসমূহে দ্রæতগতিসম্পন্ন বাতাস অপেক্ষাও দ্রæততম মনে হতো।’
হিজরতের পূর্বে রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়নি কেন, প্রশ্ন করা যেতে পারে। এর জবাবে বলা যায় যে, রোজা ফরজ হওয়ার আয়াত এমন সময় নাজিল হয় যখন মুসলমানদের অন্তরে আকীদা বা বিশ্বাস গভীরভাবে বদ্ধমূল হয়েছিল এবং নামাযের প্রতিও তাদের বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়েছিল। মুসলমানগণ আল্লাহতালার আহকাম ও শরিয়তের নিয়ম-কানুনসমূহের প্রতি অনুগত হয়ে উঠেছিল, তাদের অন্তরে তৌহিদ ও নামাযের প্রতি বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল এবং কোরআনের নির্দেশাবলির সাথে তাঁরা পরিপূর্ণভাবে পরিচিত হয়েছিল। এমতাবস্থায় হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে রোজা পালনের নির্দেশ আসে। আর এটাই ছিল উপযুক্ত সময়। তাই হিজরতের পর রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়। 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন