ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭, ০৮ সফর ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

শুরুর আগেই অর্থ লোপাটের পাঁয়তারা

শাহজালাল বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ

উমর ফারুক আলহাদী | প্রকাশের সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি ভিত্তিতে তৃৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প কাজ শুরুর আগেই অর্থ লোপাটের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিভিল এভিয়েশন ও মন্ত্রণালয়ের যোগসাজশে একটি প্রভাবশালী মহল এ প্রকল্পের নামে অর্থ লোপাটের নানা ফাঁদ তৈরি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি ৪৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রকল্পটির জন্য নির্মাণসামগ্রী এবং শ্রমিক মজুরি ব্যয় ধরা হয়েছে আন্তর্জাতিক মূল্যে। অথচ বাংলাদেশে নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিক মজুরি অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক কম। এ ব্যাপারে বারবার আপত্তি জানানোর পরও রহস্যজনক কারণে সিভিল এভিয়েশন তা মানতে রাজি নয় বলে পরিকল্পনা কমিশন থেকে বারবার আপত্তি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত ডিপিপি তৈরির আগে ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কারিগরি প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭০ কোটি ৭৯ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। অযৌক্তিক এ প্রস্তাবে আপত্তি জানানো হলেও কোনো কিছুই মানতে নারাজ সিএএবি। অন্যান্য দেশে বাস্তবায়িত প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা না করে বাংলাদেশের প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে ব্যয় নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে পাবলিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট (পিডবিøউডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কিংবা ঢাকা ওয়াসার নির্মাণ ব্যয়ও যাচাই করার প্রস্তাব দেয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশনের এ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য প্রকাশ করে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশোধন করে ব্যয় পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী মহল মরিয়া হয়ে উঠেছে। বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে আগের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক দরেই ব্যয় বহাল রেখে পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। পরে আবারো বাংলাদেশের দরে ব্যয় নির্ধারণে বিমান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় পরিকল্পনা কমিশন। এতে টনক নড়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থার। শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে প্রকল্পটি চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উত্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন।
জানা যায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের আয়তন দুই লাখ ২৬ হাজার বর্গমিটার। নতুন কার্গো ভিলেজের আয়তন হবে ৪১ হাজার ২০০ বর্গমিটার। ভিভিআইপি কমপ্লেক্স পাঁচ হাজার ৯০০ বর্গমিটার। পার্কিং অ্যাপ্রোন চার লাখ ৯৮ হাজার ৫০০ বর্গমিটার। এ ছাড়া র‌্যাপিড এক্সিট অ্যান্ড কানেকটিং টেক্সিওয়ে, তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের সঙ্গে মূল এয়ারপোর্টের সড়কের কানেকটিভিটি তৈরি করা হবে।
জাপানের নিপ্পন কায়ো, ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্ট গেøাবাল, সিঙ্গাপুরের সিপিজি কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশের ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেড যৌথভাবে এ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তদারকি করবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েরর (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেছেন, সাধারণ যাত্রীদের সুবিধাগুলো সমন্বয় করে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, এখন মানুষের চাপ বাড়ছে। তার সঙ্গে যোগানটা ম্যাচিং না করলে ভবিষ্যতে উন্নয়ন কমে যাবে। টার্মিনাল বড় করার মধ্যে ক্রেডিট নেই। বর্তমান এয়ারপোর্টেই তো মানুষ সরাসরি যেতে পারে না।
বাংলাদেশের একমাত্র গেটওয়ে ঢাকার এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির একমাত্র রানওয়েকে আরো ব্যস্ত করে ঝুঁঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। এ কারণেই রাজধানী শহরে অন্তত একটি বিকল্প বিমানবন্দরের ব্যবস্থা থাকে। এই (তৃতীয় টার্মিনাল) প্রকল্পটি না করে দরকার ছিল প্রস্তাবিত (নতুন) বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরটি তৈরি করা। যদিও সেটা হতে ২০-২৫ বছর লাগবে।
তাই চাপ সামলাতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে মেট্রো, ডেডিকেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় থাকতে হবে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই যাত্রীরা যানজটে পড়ে যায়, তখন হয়তো আরো বেশি চাপ বাড়বে, আরো বেশি সমস্যা হবে। এ ধরনের উন্নয়ন অযৌক্তিক উন্নয়নে পরিণত হবে। এয়ারপোর্ট এলাকায় নির্মাণাধীন কয়েকটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সমালোচনাও করেন শামসুল হক।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়াও এ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। তার মধ্যে জাইকার নমনীয় ঋণ ১১ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। তবে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটির ইট, বালু, সিমেন্ট ও শ্রমিক মজুরিসহ অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব ধরা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য অনুযায়ী। এর মাধ্যমে বড় ধরনের অর্থ লুটপাটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) বলছে, জাইকার নমনীয় ঋণের অর্থায়নে অন্যান্য দেশে বাস্তবায়িত প্রকল্পের ব্যয় বিবেচনা করে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির অঙ্গভিত্তিক ব্যয় হিসাব করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিক মজুরি অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক কম। স¤প্রতি প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনা কমিশন, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সিএএবিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কর্মকর্তারা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগেও সরকারি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে সিভিল এভিয়েশন ও বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ না দিয়ে সিএএবির প্রধান প্রকৌশলী নিজেই পিডির দায়িত্বে রয়েছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২২ সালের জুনের আগেই প্রধান প্রকৌশলীর চাকরি মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তার পরও প্রধান প্রকৌশলীকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধান প্রকৌশলীকে এমনিতে সার্বিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই প্রকল্পের জন্য আলাদা পরিচালক নিয়োগ করা প্রয়োজন। এতে করে কাজেরও গতি আসবে।
সিএএবি সূত্র জানায়, বিমানের পরিবহনে বর্ধিত চাহিদা বিবেচনায় শাহজালালের বর্তমান টার্মিনালটি ২০১৮ সালের মধ্যে ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০২৫ সালের এক কোটি ৪০ লাখ যাত্রী, ২০৩৫ সালে দুই কোটি ৪৮ লাখ যাত্রী বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে পূর্তকাজে (ভ‚মি উন্নয়ন, পেভমেন্ট ওয়ার্কস, অ্যাপ্রোন ট্যাক্সিওয়ে, সোল্ডার, রোড. ড্রেনেজ, সীমানা প্রাচীর) প্রস্তাব করা হয়েছে দুই হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। প্রকল্পে বিল্ডিং ওয়ার্কস (নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল, টানেলসহ কারপার্কিং, কার্গো কমপ্লেক্স, ভিভিআইপি কমপ্লেক্স) ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। ইউটিলিটি খাতে ৮৭৫ কোটি, প্রশাসনিক ব্যয় ১৪৫ কোটি ও পরামর্শক ব্যয় ৩৭১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
সিভিল এভিয়েশন প্রকৌশল বিভাগ জানায়, তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের সফট ওপেনিং এবং ২০২১ সালের এপ্রিলে নির্মাণ কাজ শেষ হবে।
মেনন বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি বাৎসরিক ৮ মিলিয়ন এবং কার্গো হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি বাৎসরিক দুই লাখ টন। বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ইতোমধ্যে সক্ষমতা হারিয়েছে। ২০১৮ সালে যাত্রী হ্যান্ডেলিং ক্যাপাসিটিও সক্ষমতা হারাবে। এ জন্য বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ইতোমধ্যে সক্ষমতা হারিয়েছে। আগামী বছর নাগাদ যাত্রী হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হারাবে। এ জন্য আরো একটি টার্মিনাল নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। দ্রæত তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করা না হলে বিমান চলাচল ও গ্রাইন্ড হ্যান্ডিলিং কাজে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বিমানবন্দরে এখন যাত্রীর তুলনায় বোর্ডিং ব্রিজ, চেকিং কাউন্টার এবং ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সংখ্যা অনেক কম। এ সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ কারণে অনেক সময় ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়। এমন অবস্থায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন