ঢাকা, বুধবার , ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

দুঃখ ঢাকার জায়গা নেই

হারুন আর রশিদ | প্রকাশের সময় : ২৯ অক্টোবর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম


মানব রচিত সবকিছু পরিবর্তন, পরিবর্জন, পরিবর্ধন করা সম্ভব। মানুষের তৈরি বিধান মানুষই পরিবর্তন করতে পারে, যদি দেখা যায় বিধানটি দেশের চলমান জীবনে সৃষ্টি করেছে। বিগত ৪৭ বছরে আমাদের দেশের সংবিধান বহু কাটাছেড়া করা হয়েছে। যারা সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ট আসন পান তারাই এই কাজটি করেন। এখন সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। দলটি ক্ষমতায় এসে সংবিধানে বহু সংশোধনী এনেছে। এখনো চাইলে জনস্বার্থে সংবিধান সংশোধন করে একটি সুন্দর নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারে। এটা পুরোপুরি দলের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করছে। ক্ষমতায় থাকলে সরকারের দাপট বেশি থাকে। যখন ক্ষমতায় থাকে এই দাপটের জোরে বড়দল ভাঙ্গার চেষ্টা করে। ইতোমধ্যে বিএনপির ২০ দল থেকে দুটি দলের অংশ ভেঙে বেরিয়ে বেরিয়ে গেছে। ওদিকে জেএসডি সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা আসম আবদুর রব বলেছেন, সরকারের একটি অংশ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার অন্যতম রক্ষা কবচ আইনের শাসন। ঠিক তদ্রপ গনতন্ত্রেরও রক্ষা কবচ সুশাসন। আইনের শাসন এবং সুশাসন দেশে না থাকলে দেশে স্বাধীনতা যেমন থাকেনা তেমনি গনতন্ত্রও থাকে না। আরেকটু এগিয়ে যাই, ‘নৈতিকতা শিক্ষা’ জরুরি। এক মাত্র যে শিক্ষা সকলকে অন্যায় কর্মকান্ড থেকে দূরে রাখতে পারে সেটাই নৈতিকতা শিক্ষা। দেশে সুশাসনের সংকটের বড় উদাহরণ হলো, বিচার বিভাগের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আর সংবাদ মাধ্যম শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ছায়া সরকারের ভ‚মিকা পালন করে। এ গুলো আমাদের দেশে বিদ্যমান কতটুকু আছে সে বিষয়ে যথেষ্ঠ ভাবনার প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ নং ধারায় বর্নিত আছে নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা। তা বাস্তবে কতটুকু কার্যকর আছে সেটাও ভাবনার বিষয়। সরকারের মধ্যে সহনশীলতা যত শক্তিশালী হবে সামাজিক মূল্যবোধের কাঠামো দৃঢ় তত হবে।
১৭ অক্টোবর ২০১৮ একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম স্বাধীন দেশে সরকার ছাড়া আর কেউই স্বাধীন নয়। ‘আমার ভোট আমি দেবো, তোমার ভোটও আমি দেবো, যখন খুশি তখন দেবো, দিনের ভোট রাতে দেবো’ এ মন্তব্য করেছেন, সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব ও সরকারি কর্ম কমিশনের (পি এস সি) সাবেক চেয়্যারম্যন ড. সাদাত হোসেন। সোমবার ১৫ অক্টোবর ২০১৮ যমুনা টিভির টকশোতে তিনি এ কথা বলেন। তার বক্তব্যর সার কথা হলো, একমাত্র সরকার ছাড়া আর কেউ স্বাধীন নয়। কিন্তু গোটা বিশে^ই প্রচলিত বাক্যটি হলো, বিশেষ করে যা ভোটারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ‘আমার ভোট আমি দেবো, যকে খুশি তাকে দিব।’ কিন্তু এখন সরকারী দল বলবে আমরা ভোটারদের আরও ক্ষমতায়ন করেছি। এ ক্ষমতাও তাদের দেয়া হয়েছে যা স্লোগান দিয়ে তারা জানান দেবে আমার ভোট আমি দেবো, তোমার ভোটও আমি দেবো, যখন খুশী তখন দেবো দিনের ভোট রাতে দেবো। এখন পুরোপুরি ক্ষমতায়িত হয়েছে ভোটাররা। দলীয় সরকার ক্ষমতায় রেখে নিরেপেক্ষ নির্বাচন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করা দিবাস্বপ্ন বা অলিক কল্পনা। রাষ্ট্রযন্ত্র এমনভাবে সাজানো হয়েছে, দলীয় সরকার নিরপেক্ষ থাকলেও যখন তারা ক্ষমতায় থাকবে তখন নির্বাহী প্রশাসনের কর্মকতা ও কর্মচারীরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে না। সেটা যদি উপর থেকে নিদের্শ দেয়া হয়, এমনকি প্রধানমন্ত্রী রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষনা দেন যে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে, তাও সম্ভব হবেনা। স্বাভাবিক প্রবনতা থাকে যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলকে তারা খুশী করতে চেষ্টা করবে। এই সুত্র পাল্টে যাবে যদি বড় রকম কোনো আন্দোলন করে প্রশাসনকে সীমানা দেয়ালের উপর বসানো যায়। সেরকম হবে কিনা তাতে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাতে এটা যদি সম্ভব হয় তবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতি চর্ম চোখে দেখতে পারবে। ওই টকশোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন ইসির বক্তব্য নিয়েও বির্তক আছে, এই বলছে সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবো না আবার বলছে দিতে পারবো। তার অধীনে অতীতের সিটি কারপোরেশন নির্বাচনগুলো বিতর্কের উর্দ্ধে উঠতে পারেনি। এ ব্যপারে আরো পরিস্কার ও সুস্পষ্ট হয়ে গেল ইসি মাহবুব তালুকদারের ‘নোট অব ডিসেন্টে’ এ সন্দেহ আরও ঘনিভ‚ত করে দিলো যে, দলীয় সরকারের অধীনে এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র বিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, সিইসি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যে আলোচনা করেছে সেগুলো ছিল লোক দেখানোর জন্য। কিন্তু তাদের এজেন্ডা পূর্ব নিধারির্ত। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও স্টেক হোল্ডাররা যা বলছে সেগুলো তাদের কাছে কোনো বিষয় না। তারা পূর্ব পরিকল্পিত পাথেই যাচ্ছে। তার মতে, এখানে গনতন্ত্র বলতে কিছুই নেই। এখানে সংসদে বিরোধী দল নেই। এখন সংসদে যাদের বিরোধী দল হিসেবে রাখা হয়েছে এবং আগামীতে যারা আসবে তারা সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েই কাজ করবে। এটা ১৭ বছরের শিশুও বুঝে। ক্ষমতার পালা বদল এখন ওপেন সিক্রেট। বেগম এরশাদের যে অবস্থা দেখি তাতে একজন নারী হয়ে নিজের কাছে লজ্জা লাগে। উনি বক্তব্য দিচ্ছেন আর তার দলের লোকেরা হাসছে। উনার কোনো সেল্প রেসপেক্ট নেই। অতীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যতটা নির্বাচন হতে আমরা দেখেছি সেখানে সিইসিকে তত্ত্বাবধায় সরকার এতোটা চাপে রাখেনি । তখন সিইসি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। আগামী নির্বাচনে সেটা সম্ভব হবে না। কারন হলো, গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলা তান্ত্রিকভাবে সাজানো হয়েছে যেখানে সরকার পছন্দনীয় লোক ছাড়া আর কারো জায়গা দখল করার সুযোগ নেই। এখন যদি সরকার চায় আমি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে জনগনকে দেখিয়ে দেব তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব।
১৬ অক্টোবর ২০১৮ বেসরকারী টিবি চ্যানেলে দেখলাম, ইসি মাহবুব তালুকদার তার মত প্রকাশে বাধা দেওয়ার কারনে অনুষ্ঠান বর্জন করছেন এবং আগামী ১০ দিনের ছুটি নিয়ে তার মেয়ের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন। মানুষ বলাবলি শুরু করছে, ইতোমধ্যে সাবেক বিচারপতি এস কে সিনহার মতো এক জঠিল অবস্থায় তিনিও পড়েছেন। বিরোধীতা করলে অর্থাৎ নিজের অবস্থান থেকে সঠিক কথাটি বললেই যে কেউ হয়ে যান গায়েবীভাবে বিএনপি, যেমনটি হয়েছিল সাবেক বিচারপতি এসকে সিনহা। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে সিইসি সহ বাকি চারজন আওয়ামীলীগপন্থী। বাস্তবতায় এটাই দেখা যাচ্ছে। সরকার বলছে, দেশ এখন অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভাল চলছে। কিন্তু বিডিটুডে, নেট বলেছে ২০০৯-২০১৮ আওয়ামীলীগ সরকারের দশ বছরে দেশে খুন হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৯৪ জন। আওয়ামীলীগ সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকেই সারাদেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটতে থাকে। অবৈধ পথের ধনী মানুষগুলো আজ সমাজে সম্মানিত, আর সৎ পথের গরীব মানুষগুলো আজ সমাজে বড়ো অবহেলিত। এ দুঃখ ঢাকি কিভাবে?
লেখক: গ্রন্থকার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন