ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

চীনে করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা

অজয় কান্তি মন্ডল | প্রকাশের সময় : ২৫ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০১ এএম

চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের রাজধানী ফুজো শহরের শেষ প্রান্তেই আমাদের বসবাস। আমাদের বসবাসের কাউন্টির নাম ‘মিনহউ’ হলেও ‘ইউনিভার্সিটি টাউন’ নামে সবার কাছেই সুপরিচিত। কারণ, এখানে আছে ফুজিয়ান প্রদেশের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালেয়র একটি করে শাখা ক্যাম্পাস। মূল শহরকে যানজট ও কোলাহল মুক্ত এবং সর্বোপরি ছাত্রছাত্রীদের চলাফেরাকে নির্বিঘ্নও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার জন্য ফুজো শহরে অবস্থিত প্রধান শাখার পাশাপাশি দ্বিতীয় এই শাখাগুলো শহর থেকে একটু দূরেই করা হয়েছে। করোনাকালীন সময়ের আগের দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে সকালের প্রাতঃভ্রমণে বের হয়ে এখানকার প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের।
স্বচক্ষে অবলোকন ব্যতীত এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর সৌন্দর্য, ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার পরিবেশ, পাশাপাশি আনুসঙ্গিক সুবিধাদি লিখে শেষ করা যাবে না। তারপরেও সামান্য কিছু তুলে ধরলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো বড় হওয়ায় ভিতরে ছাত্রছাত্রীদের বিনা পয়সায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সরবরাহকৃত সাইকেল এবং ই-বাইক (সব ক্যাম্পাসে নয়) ব্যাবহারের সুযোগ আছে। এগুলো শুধুমাত্র ক্যাম্পাসের ভিতরে ছাত্রছাত্রীরা ব্যবহার করে তাদের আবাসিক হল, ডাইনিং রুম, ক্লাস রুম, ল্যাবে খুব দ্রুত সময় পৌঁছাতে পারে। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট ছোট স্টুডেন্ট কোচ আছে, যেগুলো ছাত্রছাত্রীদের পরিবহনের জন্য প্রতিনিয়ত রাউন্ড দেয়। তবে এক্ষেত্রে ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক চর্চার আসর বসে। সেখানে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী সঙ্গীতসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। সব রকমের খেলাধুলার জন্য খেলার মাঠের সার্বিক সুবিধা আছে। ব্যায়ামের জন্য আছে অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদির সুবিধাসহ জিমনেশিয়াম। আমার কাছে সবচেয়ে নজর কেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ব্যবস্থা। ছাত্রছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ ডাইনিংগুলো এখানে মানসম্মত খাবার পরিবেশন করে। প্রতিটা ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হলগুলোর পাশেই তিন থেকে চার তলা বিশিষ্ট একাধিক ডাইনিং ভবন অবস্থিত। যেকোন রকমের ফাস্ট ফুড, বার-বি-কিউ, বুফে ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ভবনগুলোর প্রতিটা ফ্লোরে আছে ভিন্ন ধাঁচের খাবারের ব্যবস্থা। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ থেকে শুরু করে সবাই যেকোন ফ্লোর থেকে স্বল্প খরচে এই খাবারের স্বাদ নিতে পারে। তাই খাবারের রুচির পরিবর্তনের জন্য ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাসের বাইরে খেতে যাওয়ার তেমন দরকার পড়ে না।
এখানে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শীতকালীন, গ্রীষ্মকালীন, শরৎকালীন অবকাশসহ অন্যান্য যেকোন উৎসবের ছুটিগুলো একই সাথে শুরু এবং শেষ করে। সাধারণত অন্য ছুটির সময়গুলোতে, যেমন গরমের ছুটি, শরৎকালীন ছুটির সময়ে দীর্ঘদিন ক্লাস বা শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ক্যাম্পাস ছেড়ে সকল ছাত্রছাত্রী ছুটি কাটাতে বাড়ি যায় না। ল্যাবগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমও চলতে থাকে। কিন্তু শীতের ছুটি ব্যতিক্রম এই জন্য যে, এ সময়ে পুরো ক্যাম্পাস খালি হয়ে যায়। ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হলগুলো থেকে শুরু করে ডাইনিং, খেলার মাঠ, ল্যাব সবখানেই জনমানবহীন খাঁ খাঁ করার চিত্র চোখে পড়ে। শিক্ষকরাও এসময়ের ছুটি কাটাতে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে দর্শনীয় স্থান পরিভ্রমণে বা নিজ নিজ জন্মস্থানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়েন। এ সময়টাতে যেসব ক্যাম্পাসে শুধুমাত্র বিদেশি ছাত্রছাত্রী আছে তাদের উপস্থিতি ছাড়া চীনা ছাত্রছাত্রীদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবারও দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর গুনে তবেই সেই কাক্সিক্ষত শীতের ছুটি চলে আসে। শীতকালীন অবকাশ, চীনা নববর্ষ এবং বসন্ত উৎসবকে সামনে রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিনপঞ্জিতে থাকা রুটিন অনুযায়ী ১১ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়। খুবই উৎফুল্ল থাকে সব ছাত্রছাত্রী এ সময়টাতে। বিশেষ করে, পরিবারের সাথে সময় কাটানো এবং অনেক উৎসবকে সামনে রেখে তারা সবাই পাড়ি জমায় নিজ নিজ বাড়িতে। সেজন্য বরাবরের ন্যায় এবছরও ক্যাম্পাসগুলো দ্রুত খালি হয়ে যায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাস খুলবে সেই হিসাবেই তারা ক্যাম্পাসে ফিরবে এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তাদের বাড়ি ফেরা। কিন্তু এবারের ছুটি কাটিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে নির্ধারিত সময়েরও চার মাসের অধিক সময়।
করোনার দাপটে চীনসহ পুরো বিশ্ব যখন স্থবির, তখন জনজীবনে সর্বক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাও কখন স্বাভাবিক হবে সেটার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনি। কিন্তু আশ্চার্যন্বিত হলেও সত্য, বিশ্ব থমকে থাকলেও চীন কিন্তু এই দুঃসময়েও এগিয়ে চলেছে। স্বাভাবিকভাবে সবারই প্রশ্ন জাগতে পারে, কীভাবে এই দুঃসাধ্য সাধন করল চীনা সরকার। তারই কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে করোনা পরবর্তীকালীন সময়ে ফুজো শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কিছু নিয়ম কানুন তুলে ধরতে আজকের লেখা।
করোনার তীব্রতা কমার সাথে সাথেই সব প্রদেশে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করে চীন। এক প্রদেশের সাথে অন্য প্রদেশের যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করতে একটু সময় নেয় কর্তৃপক্ষ। সতর্কতা অবলম্বন করায় অল্প কিছুদিনের ভিতরেই সব প্রদেশে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এরপর নিজেদের করোনা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভের সাপেক্ষে যেসমস্ত চীনা শীতকালীন ছুটিতে গিয়ে বিভিন্ন প্রদেশে আটকা পড়েছিল তারা তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ পায়। স্বাভাবিক সব কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরে প্রশাসন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে নানান কৌশলের কথা চিন্তা করতে থাকে। পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসাবে প্রশাসন সর্বপ্রথমে নিজ নিজ প্রদেশের হাইস্কুলগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। হাইস্কুল প্রথমে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে একটায় কারণ ছিল যে, হাইস্কুলগুলোতে সাধারণত অন্য প্রদেশের কোনো ছাত্রছাত্রী থাকে না। তাছাড়া হাইস্কুলে পড়াকালীন বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী তাদের বাবা মায়ের সাথে ছুটি কাটিয়ে নিজ নিজ প্রদেশে ফিরে কোয়ারেন্টাইনের নির্দিষ্ট সময় শেষ করেছে। প্রথম পদক্ষেপেই প্রশাসন আশানুরূপ ফল পায়। এর ফলে নতুন করে ভাইরাসের কোনো বিস্তার হয়নি। এরপর খুলে দেয় বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে সকল প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কলেজগুলো। সেখানেও প্রশাসন ভালো ফল দেখতে পায়।
এভাবে কিছুদিন চলার পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো খোলার সিদ্ধান্ত আসতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সব প্রদেশের ছাত্রছাত্রীরা থাকে সেজন্য এটা খুলতে গেলে প্রশাসনের সবার উপস্থিতির কথা মাথায় আনতে হবে এবং বেশ কিছু পদক্ষেপের ব্যাপারও থাকাটায় স্বাভাবিক। এছাড়া অন্য প্রদেশ থেকে যদি কোনো ছাত্রছাত্রী ভাইরাসের জীবাণু বহন করে তাহলে পুরো চীনে বিস্তার আটকানো দুঃসাধ্য হবে। সেজন্য প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলতে একটু বেশিই চিন্তা এবং কৌশল অবলম্বন করে। প্রতিবছরের জুনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা বর্ষের সেশন শেষ হয়। সে কারণে কর্তৃপক্ষ যেসব ছাত্রছাত্রীদের জুনে স্নাতক স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি শেষ হবে তাদের সর্বপ্রথমে ক্যাম্পাসে ফেরার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। এখানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তিন বছর এবং পিএইচডি গবেষণার জন্য চার বছরের সময়সীমার সুযোগ আছে। সেজন্য স্বাভাবিকভাবেই স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের সমস্ত ল্যাব ওয়ার্ক ৩/৪ মাস আগেই শেষ হয়ে যায়। শেষ সময়টাতে থাকে শুধুমাত্র তাদের গবেষণা প্রবন্ধ লেখা, গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ এবং চূড়ান্তভাবে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনের কাজ। তাই ছাত্রছাত্রীরা এই কাজগুলো বাড়িতে বসে করতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়নি।
চীন প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকায় সবখানেই ফোর জি (কোথাও কোথাও ফাইভ জি) নেটওয়ার্কিং সুবিধাসহ স্বল্প মূল্যের ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহারের সুযোগ আছে। যেমন, ২৯ ইউয়ান (প্রায় ৩৫০ টাকার মতো) দিয়ে সারামাস আনলিমিটেড ইন্টারনেট ডাটা এবং ফ্রি মোবাইলে ফোন কলের সুবিধা আছে এখানে (মোবাইল অপারেটর এবং প্রদেশভেদে কমবেশি হতে পারে, আমি উক্ত প্যাকেজটি ব্যবহার করি)। সেজন্য দেশের সকল প্রান্ত থেকে অনলাইনে নিজের গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে (থিসিস ডিফেন্স) ছাত্রছাত্রীরা আগেই তাদের ডিগ্রি নিশ্চিত করে। কিন্তু তারা যখন শীতের ছুটিতে গিয়েছিল তখন তাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত বেশিরভাগ জিনিসপত্র ক্যাম্পাসে রেখে গিয়েছিল। সেজন্য তাদের ক্যাম্পাসে ফেরা ছিল অতীব জরুরি। প্রশাসন সেবিষয়ে চিন্তা করে এবং এটাও ভাবে যে পুরাতনরা আগে ক্যাম্পাস ছেড়ে দিলে নতুনদের জন্য সুবিধা হবে। এছাড়া সবারই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার সাথে সাথে স্বপ্ন থাকে সমাবর্তনের পোশাক পরে বন্ধুদের স্মৃতি অমলিন করে রাখার।
সে অনুযায়ী ১৮ এবং ১৯ মে সকল পিএইচডি ছাত্রছাত্রী এবং আংশিক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রী যাদের শিক্ষাজীবন জুনে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের ফিরতে বলা হয়। সবাই নিজ নিজ প্রদেশ থেকে নিজেদের নেগেটিভ করোনা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরে। তবে শর্ত ছিল একটাই, তারা ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারবে না। যদি কোন জরুরি দরকারে বাইরে যাওয়া লাগে, তবে সেটা শিক্ষকের বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে বের হতে দেওয়া যেতে পারে। ২৯ ও ৩০ মে ফেরে দ্বিতীয় দফার বাকি গ্রাজুয়েট প্রার্থী ছাত্রছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এবারের সমাবর্তনের (গ্রাজুয়েশন অনুষ্ঠান) আয়োজন না থাকলেও ক্যাম্পাসে ফেরার পরে ছাত্রছাত্রীরা যে সময়টুকু পেয়েছে সেখানে সবাই গ্রাজুয়েশনের পোশাক পরে বন্ধুদের সাথে আনন্দ উল্লাস করে ফটোসেশন করে। এরপর প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রথম এবং দ্বিতীয় দফায় ফেরা ছাত্রছাত্রীরা তাদের দরকারি জিনিস নিয়ে জুনের মাঝামাঝি সময়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাঠ চুকিয়ে সবাই নিজ নিজ প্রদেশে ফেরে।
শুধুমাত্র গবেষণার জন্য অনুক‚ল পরিবেশ অর্থাৎ ল্যাবরেটরি দরকার সেজন্য দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীরা ল্যাবে আসা প্রয়োজন। তাই কর্তৃপক্ষ এবার নজর দেয় এদের প্রতি। এর পরপরই ডাক পড়ে দ্বিতীয় বর্ষের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনপঞ্জিতে ১১ জুলাই থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন অবকাশের ছুটি থাকায় আবারো সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে খুলেই যাতে ক্যাম্পাসগুলির স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৩ সেপ্টেম্বরের ঠিক ১৪ দিন আগে আগস্টের ২০ তারিখে স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের সকল ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ফেরে। সবাই নেগেটিভ করোনা রিপোর্ট নিয়েই ক্যাম্পাসে আসে। তারপরেও প্রতিবার ছাত্রছাত্রীদের ফেরার ভিতর কর্তৃপক্ষ কমপক্ষে ১৪ দিনের গ্যাপ রাখার চেষ্টা করেছে, যাতে করে যদি দুর্ভাগ্যবশত কারো শরীরে করোনা ভাইরাসের জীবাণু থেকেও থাকে তবে সেটা যেন এই ১৪ দিন সুপ্তাবস্থা থাকার মধ্যেই প্রকাশ পায়। আর প্রকাশ পেলেও যেন অন্য কেউ আক্রান্ত না হতে পারে সেই সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে একেবারেই তাড়াহুড়ো করেনি প্রশাসন। সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে সকল প্রথম বর্ষের স্নাতকোত্তর এবং স্নাতক পর্যায়ের সব ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ফেরে। বলে রাখা ভালো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিন্তু স্নাতক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীরাই বেশি থাকে। তাই তাদের ফেরার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসগুলো ফিরে পায় তার চিরচেনা রূপ। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা, ভর্তি কার্যক্রম, আবাসিক হলগুলোর আসন বরাদ্দ সবকিছুই অনলাইনে সম্পন্ন হওয়ায় সদ্য চান্স পাওয়া নতুন ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাসে ফিরতে কোনো ঝামেলা হয়নি। ২২ সেপ্টেম্বরে নতুন শিক্ষা বর্ষের কার্যক্রম শুরু হওয়ার ভিতর দিয়ে ক্যাম্পাসে আসে সদ্য চান্স পাওয়া স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ছাত্রছাত্রীরা এবং তাদের আসার মধ্যদিয়ে ফুজো শহরের প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বিশেষ করে, আমাদের আবাসিক এলাকা এখন খুবই জমজমাট।
চীনে দীর্ঘদিন থেকে ভাইরাসের নতুন করে সংক্রমণের খবর না থাকলেও প্রশাসন সকল ছাত্রছাত্রীর চলাফেরা এখনো প্রতিনিয়ত তদারকি করে। যেমন, আগে যেকেউ যখন তখন বাইরে বের হতে পারলেও এখন পারে না। সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনের তাগিদে কেউ বাইরে যেতে চাইলে শিক্ষকদের থেকে অনুমতিপত্র নিয়ে দেখালে তবেই প্রবেশদ্বারগুলোর নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বাইরে যেতে দেয়। বাইরে না গেলেও প্রতিদিনকার চলাফেরা নির্দিষ্ট অ্যাপে আপডেট দিতে হয়। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপারে একটু বলতে চাই। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে বাইরে বের হওয়া এবং প্রবেশের বেশ কয়েকটি পথ থাকলেও করোনা পরবর্তী সময়ে বেশিরভাগ প্রবেশদ্বার বন্ধ রেখে সবখানে সর্বোচ্চ দুইটা পথ খোলা রাখা হয়েছে।
প্রবেশদ্বারগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির পাশাপাশি আছে স্বয়ংক্রিয় ফেইস রিকোগনেশন (গেটে বসানো পর্দায় মুখচ্ছবি দেখে) ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবেশদ্বারের দরজা খুলে যাওয়ায় শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং নির্দিষ্ট স্টাফ প্রবেশের অনুমতি পায়। সেজন্য বাইরের কেউ ক্যাম্পাসে পূর্ব অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়াও প্রবেশের সময় শরীরের তাপমাত্রা মেপে, মাস্ক পরিধান সাপেক্ষে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মেলে। এসব নিয়মনীতি পূর্বে না থাকলেও করোনা পরিবর্তী সময়ে কঠোরভাবেই মানা হচ্ছে। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাসের বাইরে বের হওয়ার যে নিষেধাজ্ঞা সেটা ক্যাম্পাসে ফেরার প্রথম ১৪ দিন পরে কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর নিরাপত্তার ব্যাপারে ছোট্ট একটা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে চাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ক্যাম্পাসের নতুনটিতে আমার অনুষদ এবং প্রাধান ক্যাম্পাসে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কলেজ’ যেটা বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের যাবতীয় কাজ তদারকি করে। শুধুমাত্র ইন্টারন্যাশনাল কলেজের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা ছাড়া প্রধান ক্যাম্পাসে আমার যাওয়ার দরকার পড়ে না। করোনা পরবর্তী সময়ে কলেজের নোটিশ মোতাবেক একদিন প্রধান ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য রওনা হই। কিন্তু প্রধান ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বার দিয়ে নিজের পরিচিতি পত্র দেখালেও নিরাপত্তা বাহিনী আমাকে ঢুকতে দেয়নি। এরপর ইন্টারন্যাশনাল কলেজের স্টুডেন্ট কাউন্সিলরকে কল দিই, উনি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কথা বললেন তাতেও ওনাদের সম্মতি পাওয়া গেল না। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে স্টুডেন্ট কাউন্সিলর এসে নিরাপত্তা বাহিনীকে বুঝিয়ে আমাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। অল্প দূরত্ব যেতেই আরও একটা ফেস রিকোগনেশনের ব্যবস্থা লক্ষ করলাম। করোনাকালীন সময়ে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দ্বিতীয় এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এখানে পৌঁছানোর সাথে সাথে ফেইস ডিটেক্ট করে গেট খুলে গেল। বুঝলাম এটাতে আমার ফেইস ডিটেকশনের ডাটা আগে থেকে ইনপুট দেওয়া আছে। প্রথম প্রবেশদ্বারে ফেইস রিকোগনেশন কাজ না করার বিষয়ে স্টুডেন্ট কাউন্সিলরের কাছে জিজ্ঞাসা করলে উনি বললেন ‘প্রধান প্রবেশদ্বার সব ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়। কিন্তু ভিতরেরটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার জন্য, তুমি যেহেতু নতুন ক্যাম্পাসের ছাত্র তাই ভিতরেরটায় তোমার সমস্যা নেই।’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কতটা কড়াকড়ি এই নমুনাটুকুই থেকেই যথেষ্ট আঁচ করা যায়। ওই ঘটনার পরে আমি প্রধান ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগে স্টুডেন্ট কাউন্সিলরকে বলে রাখি। উনি কলেজের প্রধানের থেকে অনুমতি পত্র নিয়ে ইমেইলে পাঠানোর পরেই আমি রওনা দেই।
এখানে বেশিরভাগ পরীক্ষা পদ্ধতি ওপেন বুক ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়ে থাকে। অর্থাৎ পরীক্ষার সময় ছাত্রছাত্রীরা ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি যেকোন বই পুস্তকের সুবিধা নিতে পারে। কিন্তু একজন ছাত্রছাত্রী অন্য জনেরটা দেখে লিখতে পারবে না। সেজন্য পরীক্ষার হলগুলোতে শিক্ষকদের কড়া নজরদারি থাকে। তাই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে এদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। ওপেন বুক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি থাকায় চীনা ছাত্রছাত্রীদের সেমিস্টার লস দেওয়া বা পরের গ্রেডে প্রমোশনের জন্য অটো প্রমোশন দেওয়ার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি। সাথে সব শিক্ষার্থীদের মেধার ও যথেষ্ট মূল্যায়নের মাধ্যমেই ফলাফল নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদিও পুরোপুরি এদের নিয়মনীতি অনুসরণ করে চলা কষ্টকর, তারপরেও যতটুকু সম্ভব এদের থেকে নিয়ে বর্তমানে অচল হয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে একটু হলেও পুনুরুদ্ধার করা সম্ভব বলে আমার মনে হয়।
লেখক: গবেষক, ফুজিয়ান এগ্রিকালচার এবং ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটি, ফুজিয়ান, চীন।
ajoymondal325@yahoo.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন