ঢাকা, রোববার , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

জনভোগান্তি চরমে

হঠাৎ ঢাকা থেকে পরিবহন উধাও

আবদুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশের সময় : ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম

‘সর্প হয়ে দংশন করে, ওঝা হয়ে ঝাড়ে’ প্রবাদের মতোই হয়ে গেছেন পরিবহন সেক্টরের নেতারা। সরকার নতুন আইন করে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে; অথচ ক্ষমতাসীন দলের ছায়ায় গড়ে ওঠা পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের ইন্ধনে ‘সড়ক আইন ঠেকিয়ে দেয়ার’ চেষ্টা চলছে। পরিবহন সেক্টরের প্রায় সবগুলো শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা। কেন্দ্রীয় নেতারা মুখে আইন মেনে নেয়ার কথাও বলছেন; অথচ তাদের ইন্ধনে পরিবহণ ধর্মঘটে বিপদে পড়েছে মানুষ। আগে খুলনা ও রাজশাহীতে ধর্মঘট হলেও গতকাল হঠাৎ রাজধানী ঢাকা থেকে উধাও হয়ে যায় গণপরিবহন। ঘোষণা ছাড়াই ধর্মঘট করায় বিপদে পড়ে লাখ লাখ অফিসমুখী কর্মজীবী। বিকেলে অবশ্য ধর্মঘট তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

জানতে চাইলে বিআরটিসির চালক এনামুল হক বলেন, গণপরিবহনের অভাবে রাস্তা একেবারেই ফাঁকা। পথে কোন যানজট নেই। অফিস-আদালত চললেও গুলিস্তান থেকে কম সময়ে ফার্মগেট চলে এসেছি। চালককে মারধর ও মামলার ভয়ে অনেকে বাস নামাননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আগের দু’দিন খুলনা ও রাজশাহীর মতো গতকাল নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংশোধনের দাবিতে রাজধানী থেকে বাস উধাও হয়ে যায়। সারাদেশে পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্যের মতো ঢাকায়ও চলে একই নৈরাজ্য। চালক ও শ্রমিকদের সংগঠনের নামে অঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে দূরপাল্লার বেশিরভাগ রুটে বাস চলাচল এক কথায় বন্ধ ছিল। এতে চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। হঠাৎ ঢাকায় পরিবহণ বন্ধ রাখায় সেই দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, যারা বাস চালাচ্ছিলেন পরিবহন শ্রমিকদের কিছু নেতাকর্মী তাদের মারধোর করে বাস থেকে নামিয়ে দেয়।

গতকাল সকাল থেকে ৯ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন শুরু করে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। কেউ গাড়ি নিয়ে বের হলে তাদেরকে মারধরও করতে দেখা গেছে। পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যে পিইসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার্থীরাও চরম দুর্ভোগে পড়েন। চলমান সমস্যা নিয়ে দ্বিতীয় দফায় গতকাল রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে মালিক-শ্রমিকরা বৈঠক করেছেন। ধর্মঘটের কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসহ সব ধরণের পণ্যের দামও বেড়ে গেছে। তবে কর্মবিরতির নামে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, চাঁদাবাজি পরিবহন সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা। পরিবহনে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এ বিষয়ে কোনও রাজনৈতিক নেতারই ধর্ম নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এর সঙ্গে জড়িত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গতকাল সকালে পুরো নগরীর রাস্তা ঘাট ছিল একেবারেই ফাঁকা। রাজধানীসহ সারা দেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বন্ধ ছিল। দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থেকে হাতে গোনা কয়েকটি গণপরিবহন চোখে পড়েছে। গণপরিবহন সংকটে দুর্ভোগে পড়েন রাজধানীর বাসিন্দারা। সকাল থেকেই রাজধানীর বাসস্ট্যান্ড, সড়কের বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকে রিকশায়, ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা, অ্যাপস চালিত যানবাহন বা বিকল্প পন্থায় গন্তব্যে যাতায়াত করেন দ্বিগুন তিনগুন অর্থ ব্যয় করে। ঢাকার তিনটি বাস টার্মিনাল গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ থেকেও সকালের দিকে দূরপাল্লার এবং আন্ত:জেলার বাস চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। রাজধানীর ও আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে সব ধরণের পরিবহন চলাচলে বাধা দিয়েছে চালক ও শ্রমিকরা। তবে রাজধানীতে দীর্ঘ বিরতিতে বিআরটিসির কিছু বাস চলতে দেখা গেছে।

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন আনিসুল হক সড়ক, মহাখালী ট্রাক টার্মিনালের সামনে, টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকায় বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে বাধা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। গাড়ি নিয়ে নামায় অনেককে মারধর করেছেন বিক্ষোভকারীরা। এছাড়া গুলিস্তান, পল্টন, ফার্মগেট, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, বিজয়নগর ও নতুনবাজারসহ বিভিন্নস্থানে যাত্রীদের বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একজন নেতা বলেন, ট্রাক শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে। এর সঙ্গে মালিকদের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে দুই চারজন মালিকও এতে যুক্ত হয়েছেন। সকাল থেকে শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থানে বাসসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচলে বাধা দিচ্ছে। গাড়িতে কালি মেখে দিয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কীভাবে গাড়ি নামাই? এরপরও আমরা যাত্রীসেবায় নগরীতে এবং দূরপাল্লায় বাস ছাড়ার চেষ্টা করছি। কিছুদূর যাওয়ার পরেই শ্রমিকরা এসব যানবাহন চলাচলে বাধা দেয়। বাধ্য হয়েই গাড়ি থামিয়ে রাখতে হয়। ভয়েই অনেকে গাড়ি ছাড়ছেন না বলে তিনি জানান।

গতকাল বুধবার সকালে তেজগাঁওয়ে ট্রাক স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাকগুলো রাস্তার দু’পাশে জড়ো করে রাখা। কোনও ট্রাক ছেড়ে যায়নি। শ্রমিকদেরও কাজে যোগ দিতে দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকদের টার্মিনালে এসে অন্যান্য যান চলাচলে বাধা দিতে দেখা গেছে। শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিভিন্ন মালবাহী পরিবহনকে বাধা দিচ্ছে। এসময় আনোয়ার হোসেন নামে এক ট্রাকচালককে মারধর করেছেন আন্দোলনকারী।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ছোট্ট একটি ট্রাকে পানির জার নিয়ে তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের সামনে আনিসুল হক সড়কে আসামাত্র চালকের ওপরে চড়াও হয় আন্দোলনরত শ্রমিকরা। এসময় তাকে চড়-থাপ্পড় দেয়। পরে চালকের আসন থেকে তাকে রাস্তায় নামিয়ে আনা হয়। চালক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি দোকানপাটে পানি দেওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে এখানে এসেছি। এরপর কী হয়েছেÑ তা আপনারা দেখেছেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

ফার্মগেটের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। অন্যান্য পরিবহন না থাকায় বিআরটিসি বাসই ছিল একমাত্র ভরসা। দীর্ঘক্ষণ পর পর একটি বাস আসতে দেখলেই যাত্রীদের ছোটাছুটি শুরু হয়। কার আগে কে উঠবে এমন প্রতিযোগিতা চললেও অধিকাংশ যাত্রীরাই উঠতে পারেননি। ফার্মগেটে তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেও গাজীপুর চৌরাস্তার বাসে উঠতে পারেনি আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, অন্যান্য পরিবহনের বাস নেই বললেই চলে। তবে দীর্ঘ সময় পর পর বিআরটিসির বাস আসলেও তাতে ওঠা যাচ্ছিল না। তবে নগরবাসীর ভোগান্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিএনজি অটোরিকশার পাশাপাশি অ্যাপস পরিচালিত গাড়ি ও বাইকাররা অ্যাপস বন্ধ করে কয়েকগুন বেশিতে যাত্রী বহন করেছেন।

তেজগাঁওয়ের মতো সকালের দিকে যাত্রাবাড়ীর অবস্থাও ছিল খুবই খারাপ। প্রায় ৭ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখার পর যাত্রাবাড়ীর রাস্তা ছেড়ে দেন শ্রমিকরা। এর আগে সকাল থেকে যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড এলাকায় বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ অংশে বাস চলাচলে বাধা দিয়েছেন ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চালক ও শ্রমিকরা। এছাড়া ডেমরাসহ বিভিন্ন জায়গায় বাধার কারণে রাজধানীতে গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল অনেক কম। যাত্রাবাড়ী এলাকায় আওলাদ হোসেন নামে এক শ্রমিক বলেন, বিভিন্ন মালবাহী ট্রাক চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তবে দু’চারটি বাস ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

এদিকে, ধর্মঘটের কারণে সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় পিইসি পরীক্ষার্থীদের নিজ গাড়িতে কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছেন ডেমরা ট্রাফিক জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. রবিউল ইসলাম রাজু। ছোট্ট শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা সকাল ৯টার পর থেকেই যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে ভিড় করেও কোন গাড়ি পাননি। একইসঙ্গে সরকারি তোলারাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছিল। এ সময় রবিউল ইসলাম রাজু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিজের গাড়িতে কেন্দ্রে পাঠান। এছাড়া আশপাশ থেকে আসা কয়েকটি পিকআপ ভ্যান ভাড়া করেও শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের তুলে দেন।

সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ অংশে শ্রমিকরা রাজধানীতে বাস প্রবেশে বাধা দিলেও দুপুর দেড়টার পর থেকে আবারও যান চলাচল বেড়েছে বলে জানান ডিএমপি ট্রাফিক ডেমরা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, বাস চলাচলে বাধা দেওয়ার কারণে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ হয়েছে। তাদের কথা ভেবে আমরা মহাসড়কে রিকশা ভ্যান চলাচলের অনুমতি দিয়েছি।

এদিকে ধানমন্ডি এলাকায় সকাল থেকে গণপরিবহনের সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও চলাচলে বাধার কোনও খবর পাওয়া যায়নি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের চাপ বাড়ছে বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দক্ষিণ ট্রাফিক বিভাগ ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার আকরাম হাসান। তিনি বলেন, এখানে যান চলাচলে বাধার কোনও ঘটনা ঘটেনি। আমরা সজাগ অবস্থানে রয়েছি। গাড়ির চাপ এখন স্বাভাবিক রয়েছে।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, শ্রমিকরা তাদের স্বার্থে ধর্মঘট ডেকেছে। তারা যদি আমাদের ট্রাক নিয়ে রাস্তায় না নামে, আমরা কী করবো। সকাল থেকে তারা বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করছে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলি খান বলেন, আমরা ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন ডেকেছি। আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে। আমরা মনে করি আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। সরকার সেগুলো মেনে নেবে।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পরিবহন নেতাদের বৈঠক
এদিকে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের জেরে পরিবহন ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতি অবসানে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বুধবার রাত সাড়ে ৯টার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসভবনে এ বৈঠক শুরু হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) শরীফ মাহমুদ অপু দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ধানমন্ডির নিজ বাসভবনে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে বাস, ট্রাক ও পণ্য পরিবহন মালিক শ্রমিক সমিতির নেতারা উপস্থিত হন। বৈঠক শেষে এ বিষয়ে জানানো হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এদিকে, বৈঠককে কেন্দ্র করে রাত সাড়ে ৮টার পর থেকেই বিভিন্ন পরিবহন শ্রমিক নেতারা মন্ত্রীর বাসভবনে আসতে থাকেন। পরিবহন ধর্মঘটের তৃতীয় দিনেও দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ ছিলো। এর ফলে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও চালকরা যানবাহন নিয়ে বের হলেও অন্য পরিবহন শ্রমিকদের রোষে পড়তে হয়।


ধর্মঘট প্রত্যাহারের দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির
এদিকে, কর্মবিরতির নামে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একইসঙ্গে মালিক-শ্রমিক-যাত্রী সব মহলকে সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করারও দাবি জানায় সংগঠনটি।

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, একটি চিহ্নিত কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী পরিবহন সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন সময়ে সরকারের ভালো কাজগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এই গোষ্ঠী জনগণের প্রত্যাশিত নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। তারা নিরীহ শ্রমিকদের মাঝে গুজব রটিয়ে ফায়দা হাসিল করতে চায়। এই মহলটি পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, ধান্ধাবাজি, নৈরাজ্য জিইয়ে রেখে দীর্ঘদিন ধরে তাদের স্বার্থ হাসিল করে আসছিল। নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন হলে তাদের এ জাতীয় অনৈতিক কর্মকা- বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় তারা আবারও নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তাদের খুঁজে বের করে দ্রুত আইনের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।

রাজশাহী : রাজশাহীতে দুপুরে নওদাপাড়া আম চত্ত্বর মোড়ে একদল পরিবহন শ্রমিক বাস চলাচলে বাধা দেয়। এনিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সকাল থেকে রাজশাহীতে বাসসহ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল করে। সকালে রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের রাস্তায় গাড়ি বের করার নির্দেশ দেন। রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মতিউল ইসলাম টিটো বলেন, এই ধর্মঘটে মালিকদের কোনো সমর্থন নেই। অনেক শ্রমিক গাড়ি চালাচ্ছেন না। এটি তাদের বিষয়।

বরিশাল : প্রায় ২০ঘণ্টা পরে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক পথে যাত্রী পরিবহন শুরু হলেও ট্রাক, কভার্ড ভ্যান ও ট্যাংক লড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। তবে একই সাথে গতকাল সকাল থেকে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল যুড়ে সবধরনের পণ্যবাহী ট্রাক ও কভার্ড ভ্যান সহ ট্যাংক লড়ির ধর্মঘট শুরু করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। এর ফলে এ অঞ্চলে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে।

যশোর : পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে। যশোর, খুলনা, মাগুরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। সড়ক-মহাসড়ক কার্যত নীরব নিস্তব্ধ, নেই কোন শব্দ। বাস ট্রাক কাভার্ড ভ্যানসহ যান চলাচল প্রায় বন্ধ। সকাল থেকে ছোটখাটো যান চলাচলও কমে গেছে। ভেজিটেবল জোন যশোর থেকে সবজির ট্রাক ছেড়ে যায়নি । পরিবহণ ধর্মঘটের কারণে হাইওয়েতে নিষিদ্ধ নছিমন করিমন স্থানীয়ভাবে যাতায়াতে কদর বেড়েছে বহুগুণ। ভাড়াও হাঁকছে অতিরিক্ত।

বগুড়া : বগুড়াতে পরিবহন ধর্মঘটে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ ও দুরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড বন্ধ থাকায় চাপ পড়েছে ট্রেনের ওপর। গতকাল ঢাকাসহ দেশেল বিভিন্ন স্থানে যাবার জন্য একটি ট্রেনের টিকিট পাবার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। সকালে কিছু গাড়ি টার্মিনাল থেকে বের হলেও সেগুলো শেরপুরের সীমানা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে শ্রমিকরা। অথচ গাড়ী যাতে কোন পরিবহন শ্রমিক বাধা দিতে না পারে তার জন্য মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে পাহারা দিলেও শ্রমিকরা তা মানছে না। অনেক শ্রমিক গাড়ির চাবি মালিকের কাছে জমা দিয়েছে

খুলনা : খুলনা থেকে কোনও দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। অভ্যন্তরীণ বেশিরভাগ রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। এ অবস্থার যাত্রীরা জরুরি প্রয়োজনে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে করে বাগেরহাট, কাটাখালী ও গোপালগঞ্জ যাচ্ছেন।

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী দুরপাল্লার যানবাহনসহ অভ্যন্তরীন রুটেও দ্বিতীয় দিনের মতো সকল ধরণের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। যানবাহন চলাচল বন্ধে ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রীরা। চাপ বেড়েছে অটো রিক্সায়। যাত্রীদের ভাড়াও গুণতে হচ্ছে দ্বিগুণ।

দিনাজপুর : দিনাজপুরে সকাল থেকে পন্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে চালকরা। ফলে সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে জেলার সবকটি রুটের পণ্যবাহী যান চলাচল। ট্রাক চালকরা জানান, সড়কে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে অটোরিক্সা, ভটভটি, নসিমনের জন্য। কিন্তু আইন না মেনে এসব যান চালালেও তদের কোন লাইসেন্স নাই।
কুমিল্লা : কুমিল্লায় পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা অবরোধ চলাকালে সড়কে চলাচলরত গাড়ির চালকদের মুখে পোড়া মবিল মেখে দিয়েছে শ্রমিকরা। সকালে কুমিল্লা শাসনগাছা ফ্লাইওভারের সামনে বিভিন্ন গাড়ির চালকদের মুখে জোরপূর্বক পোড়া মবিল মেখে দেয় অবরোধকারীরা। এতে সড়কের উভয় পাশে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকেও ছাড়েনি শ্রমিকরা। অ্যাম্বুলেন্স চালকদের মুখে মবিল মেখে দেয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ : সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল, কাঁচপুরসহ ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্নস্থানে অবস্থান নিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। তারা সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। অনেক স্থানে রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে বড় বড় যানবাহন। ফলে রাস্তা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এসময় কোনও যানবাহন চলাচল করতে গেলেই শ্রমিকরা ওই পরিবহনের চালকের ওপর হামলা করে।

বেনাপোল : বেনাপোল বন্দর এলাকায় ভয়াবহ ট্রাক সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বেনাপোল বন্দরে আমদানিকৃত পণ্য লোড আনলোড কার্যতঃ বন্ধ রয়েছে। তবে এ সময় বেনাপোল বন্দরে ভারতীয় ট্রাক হতে পণ্য আনলোডসহ দু‘দেশের মধ্যে আমদানি রফতানি বাণিজ্য সচল রয়েছে। আমদানিকৃত-পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাক না পাওয়াই বিপাকে পড়েছেন ট্রান্সপোর্ট ব্যাবসায়ীরা।

ফরিদপুর : ফরিদপুর থেকে দুরপাল্লার পরিবহনগুলো বন্ধ রেখেছে জেলার শ্রমিকরা। সকালে জেলা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন রুটের যাত্রীবাহী বাস বন্ধ রয়েছে। এদিকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর নেতারা শ্রমিকদের দাবির সাথে একমত না হলে জেলার শ্রমিকরা কিন্তু তাদের দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আর পরিবহন চালাবে না বলে জানিয়েছে।

নওগাঁ : জেলার বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে জেলার ১১টি উপজেলার সকল রুটের মেইল ও লোকাল বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে রাজশাহী ও বগুড়া চলাচলের সকল বাস। ফলে দূরপাল্লার রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।

টাঙ্গাইল : যান চালানো বন্ধ রেখেছে টাঙ্গাইলের পরিবহন শ্রমিকেরা। এতে করে চড়ম ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ যাত্রীরা।
বেলা দশটা থেকে পুরোপুরি কর্মবিরতিতে গেছে টাঙ্গাইলেল পরিবহন শ্রমিকেরা। এতে করে টাঙ্গালের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে।

হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট শুরু করেছে শ্রমিকরা। বেলা ১টার পর হঠাৎ তারা জেলার অভ্যন্তরীন সড়ক ও আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াকারী সাধারণ মানুষ।

কুড়িগ্রাম : সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে কুড়িগ্রাম থেকে সব রুটে বাস, মিনিবাস ও ট্রাক-ট্যাংকলরিসহ সব গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রেখেছে পরিবহন শ্রমিকরা। পরিবহন মালিক সমিতির এই নেতা বলেন, শ্রমিকদের এই আল্টিমেটাম যৌক্তিক, তবে ঘোষণা ছাড়া এভাবে কর্মবিরতিকে যৌক্তিক মনে করি না।
ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলও বন্ধ রয়েছে। অনেকে বাস না পেয়ে ইজিবাইক ও মহাসড়কে চলাচলে নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহনে চলাচল করছেন।

চুয়াডাঙ্গা : চুয়াডাঙ্গায় সকাল থেকে একই দাবিতে শুরু হয়েছে ট্রাক ও পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘট। দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা রুটে সব ধরনের যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ট্রাক ও পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘট শুরু হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কাঁচামাল ব্যবসায়ীরাও।

হিলি : দিনাজপুরের হিলিতে সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল। তবে হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানিসহ বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে, চলছে লোড-আনলোড ও খালাস কার্যক্রম।

মাদারীপুর : মাদারীপুরে সকাল থেকেই স্থানীয় ও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাস ও মিনিবাসের বিকল্প হিসেবে যাত্রীরা ইজিবাইক ও নসিমনে করে নির্ধারিত গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে দূরপাল্লার যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন বেশি।

মেহেরপুর : মহেরপুরে শুরু হয়েছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধর্মঘট। ফলে সকাল থেকে কোনও পণ্যবাহী পরিবহন জেলা থেকে ছেড়ে যায়নি। পাশপাশি বন্ধ রয়েছে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস। জেলাটি কৃষিপ্রধান হওয়ায় চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে কৃষক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি ব্যবসায়ী এবং ভোক্তারা।

সাতক্ষীরা : সকাল থেকে কোনও বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটের সব বাস চলাচলও। বাস চলাচল বন্ধে ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন ভোমরা স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (11)
মেহেদী হাসান ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩০ এএম says : 0
পরিবহন শ্রমিকদের সাথে যদি কোন মন্ত্রী সাক্ষাৎ করার চেস্টা করে তবে বুঝে নিতে হবে এরাই এদেশকে রসাতলে নিয়ে যাবে
Total Reply(0)
Forhad Patwary ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩০ এএম says : 0
এরাই আওয়ামীলীগের সান্ডা,পান্ডা, গুন্ডারা। যাদের হাতে আজ পরিবহন সেক্টর সহ পূরো দেশ জিম্মি
Total Reply(0)
Minmoy Chowdhury ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:২৯ এএম says : 0
আন্দোলন কিসের? মানুষের গায়ের উপর যখন গাড়ি চালাও,গাঞ্জা খাইয়া গাড়ি চালাবা,বাচ্চাদের কে বাস দিয়ে পিসবা,মানুষের মুখে কালি মাখবা, জরিমানা ধরলে আন্দোলন?
Total Reply(0)
Mahfuz Rahman ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩০ এএম says : 0
এই কোন ....... জাতির দেশ এই বাংলাদেশ? এই দেশ সন্ত্রাসী চালক ও মালিকদের কাছে জিম্মি থাকতে হয়।
Total Reply(0)
রুমানা ইসলাম ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:২৯ এএম says : 0
দেখি কদিন পারে। শ্রমিকদের তিনদিন পেটে ভাত না পড়লে এমনিতেই হাওয়া হয়ে যাবে ধর্মঘট
Total Reply(0)
Riyad Gazi ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩১ এএম says : 0
সরকার বিএনপিকে দমন করতে পারে। এখন ওদেরকে কোনো দমন করতে পারে না। অবশ্য অবৈধ চুরী করা সরকার কিভাবে অবৈধ লাইসেন্স শ্রমিক দমন করবে সেটাই কথা
Total Reply(0)
Arif Zia ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩৫ এএম says : 0
এটার জন্য বাংলাদেশে যারা দায়ী একদিন তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
Total Reply(0)
Abdul Hai ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩৬ এএম says : 0
আজ পুলিশ কে দেখলাম না জনগনের সেবায় এগিয়ে আসতে!
Total Reply(0)
আসলাম ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 0
সরকার চাইলে ২ থেকে ৩ ঘন্টার মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
Total Reply(0)
নীল প্রজাপতি ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 0
পরিবহন সন্ত্রাস নিপাত যাক !
Total Reply(0)
Rm Farhad ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১০:২৮ এএম says : 0
জনভোগান্তি যতই হোক অন্যায় দাবীর কাছে মাথা নত নয়।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন