ঢাকা শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১২ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সাহিত্য

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য

আহমেদ উল্লাহ্ | প্রকাশের সময় : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ৭:৪৭ পিএম

স্বাধীনতা প্রতিটি জাতি ও মানুষের জন্য চরম আরাধ্য ধন। আর সেই স্বাধীনতা যদি অর্জন করতে হয় সংগ্রাম, নিপীড়ন, অত্যাচার এবং রক্তের ¯্রােতের মধ্য দিয়ে, তবে তা ওই জাতি ও জনগোষ্ঠীর কাছে হয়ে ওঠে আরও বহুগূণে অর্থবহ। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কর্তক পলাশীর প্রান্তরে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলেও ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর সাথে যে মানসিক দন্ধ-সংঘাত, বিবেধ-বিগ্রহ ও ঘাত-প্রতিঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ক্রমেই অগ্নিশিখার মতো ছড়িয়ে পড়ে আমাদের মনে। এরপর থেকে ভাষা আন্দোলনসহ বহু সংগ্রাম, লক্ষ প্রাণের রক্ত, মা-বোনদের সম্ভ্রমহানী এবং কতই-না বঞ্চনা ও শোষণের ইতিহাস পাড়ি দিয়ে ১৯৭১ সালে আমরা আমাদের প্রাণের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার দেখা পাই। কিন্তু অতীতের দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর অপশাসন, অন্যায়, বঞ্চনা, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-নিপীড়ন আমাদের মন থেকে মুছে যায়নি। অপশক্তি কর্তৃক অপশাসন ও নিপীড়নের প্রতিফন ঘটেছে আমাদের সাহিত্যে। আমাদের কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং নাটকসহ সাহিত্যের সকল শাখায় অনন্যভাবে উঠে এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস।
আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত গৌরবাহ্নিত ও তাৎপর্যম-িত ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা। যে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে জড়িয়ে আছে আমাদের ত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাস। যার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য। এমনকি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অত্যন্ত গুরত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে আমাদের সাহিত্যিকগণ শিল্প-সাহিত্যে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, শৌর্য-বীর্যবত্তা এবং অসীম সাহসী গুণের সুপরিচয় যুগ-যুগান্তর ব্যাপী বিধৃত হয়ে এসেছে। সুতরাং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলা সাহিত্য অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাহিত্যে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটকের তুলনায় কবিতায় সবচেয়ে বেশি মর্মস্পর্শী হয়ে প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা।
আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে...
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ‘বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের গভীরতম এক অধ্যায় বর্ণিত হয়েছে।
রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় স্বাধীনতার প্রতি অন্তরের গভীর আকাক্সক্ষা বিকশিত হয়ে ওঠে-
‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে চায়’
কবি শামসুর রাহমানের- ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, ‘বারবার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট’, সন্ত্রাসবন্দী বুলেটবিদ্ধ দিন-রাত্রি’, ‘স্বাধীনতা তুমি’; শহীদ কাদরীর- ‘রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন’; সিকান্দর আবু জাফরের- ‘জনতাকে দেখছি’; আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্র- ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’; সৈয়দ শামসুল হকের- ‘অন্তর্গত’; রফিক আজাদের- ‘সৈনিকের শপথ প্যারেড’; মহাদেব সাহার- ‘স্বাধীনতার প্রতি; নির্মলেন্দু গুণের- ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি আমাদের কী করে হলো’সহ অসংখ্য কবির কবিতায় ছন্দে ছন্দে অনন্য রূপ-রস ও মুগ্ধতায় উঠে এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে- শওকত ওসমানের- ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, নেকড়ে অরণ্য’, ‘দুই সৈনিক’, ‘জলাঙ্গী’; শওকত আলীর- ‘যাত্রা’; সৈয়দ শামসুল হকের- ‘নীল দংশন’, নিষিদ্ধ লোবান’; সেলিনা হোসেনের- ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’; আহমদ ছফার- ‘ওঙ্কার’; রশীদ হায়দারের- ‘অন্ধ কথামালা’; শামসুর রাহমানের- ‘অদ্ভুত আঁধার এক’; আবু বকর সিদ্দিকের- ‘একাত্তরের হৃদয়ভস্ম’; আবু জাফর শামসুদ্দিনের- ‘দেয়াল’; হুমায়ুন আহমেদের- ‘শ্যামল ছায়া’, ‘সৌরভ’; ইমদাদুল হক মিলনের- ‘ঘেরাও’ ইত্যাদি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের বাস্তব ও মর্মস্পর্শী ঘটনার বর্ণিত হয়েছে অনন্য রূপ ও রসে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছোটোগল্পের অফুরন্ত ভা-ারে সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় রচিত গল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রেইনকোট’, অপঘাত; জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘দিন ফুরানোর খেলা, আমৃত্যু আজীবন, মুক্তিযোদ্ধারা; আলাউদ্দিন আল আজাদের- ‘স্মৃতি তোকে ভুলবো না’; আবু ইসহাকের ‘ময়না কেন কয় না কথা’; আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘কলিমদ্দি দফাদার’; মাহমুদুল হকের ‘বেওয়ারিশ লাশ’; জাহানারা ইমামের ‘রায়বাগিনী’; আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘ব্ল্যাক আউট’; পূরবী বসুর ‘দুঃসময়ের অ্যালবাম’; ইমদাদুল হক মিলনের ‘লোকটি রাজাকার ছিল’ ইত্যাদি আরও অগণিত কথাশিল্পীর রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটোগল্পে বাংলা সাহিত্য আলোকিত হয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গল্পগ্রন্থের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হকের- ‘জলেশ্বরীর গল্পগুলো’; শওকত ওসমানের- ‘জন্ম যদি তবে বঙ্গে’; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের- ‘অপঘাত’; রাহাত খানের- ‘মধ্যিখানের চর’; হুমায়ুন আহমেদের- ‘শীত, ‘উনিশ শ একাত্তর’; আবদুল গাফফার চৌধুরীর- ‘কেয়া’, আমি এবং জারমান মেজর’; শামসুদ্দিন আবুল কালামের- ‘পুঁই ডালিমের কাব্য’; সুচরিত চৌধুরীর- ‘নিঃসঙ্গ নিরাশ্রিত’, রশীদ হায়দারের- ‘কল্যাণপুর’, ‘এ কোন ঠিকানা’; রিজিয়া রহমানের ‘ইজ্জত’; মইনুল আহসান সাবেরের- ‘ভুলবিকাশ’; সত্যেন সেনের- ‘পরিবানুর কাহিনি’ ইত্যাদি গল্পগ্রন্থসমূহ বাংলা ছোটগল্পগ্রন্থের জগত জ্যোতির্ময় করে রেখেছে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচিত কালজয়ী প্রবন্ধ গ্রন্থসমূহের মধ্যে- জাহানার ইমামের- ‘একাত্তরের দিনগুলো’; সেলিনা হোসেনের- ‘একাত্তরের ঢাকা’; আসাদ চৌধুরীর- ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’; শামসুল হুদা চৌধুরীর- ‘একাত্তরের রণাঙ্গন’ এবং আনোয়ার পাশার- ‘রাইফেল রুটি আওরাত’সহ আরও বহু প্রবন্ধগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে রেখেছে।
সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা নাটক। নাটকের মাধ্যমেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিকথা অনন্যভাবে দৃশ্যায়মান হয়ে ওঠেছে। মমতাজ উদ্দিন আহমদের- ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’, বকুলপুরের স্বাধীনতা’, কি চাহ শঙ্খচিল’; নীলিমা ইব্রাহিমের- ‘যে অরণ্যে আলো নেই’; সৈয়দ শামসুল হকের- ‘পায়ের আওয়াজ’; জিয়া হায়দারের- ‘সাদা গোলাপে আগুন’; আলাউদ্দিন আল আজাদের- ‘নিঃশব্দ যাত্রা’, ‘নরকে লাল গোলাপ’ ইত্যাদি মঞ্চ নাটকগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে- আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্য, পাক হায়েনাদের বর্বরতা প্রতিচ্ছবি, রাজাকার, আলবদরসহ দেশদ্রোহীদের ঘৃণ্যমত ইতিবৃত্ত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ইমদাদুল হক মিলন এবং হুমায়ুন আহমেদ টেলিভিশন নাটক রচনায় অনন্য অবদান রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছড়া সাহিত্যেও অনন্যভাবে উঠে এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মহান স্বাধীনতা। সুকুমার বড়–য়া, লুৎফুর রহমান রিটন, আমিরুল ইসলাম এর ছড়ায় মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে ছন্দ-মাত্রার আবদ্ধে। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে হুমায়ুন আহমেদ, আবু কায়সার, শাহরিয়ার কবির, মাহমুদুল হক প্রমুখ অনন্য অবদান রেখেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের গৌরবগাঁথার আবেগময় স্থিতি এতটুকুও কমেনি আদৌ, বরং দিনদিন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের গৌরবগাঁথা ইতিহাস নতুনরূপে সাহিত্যিকের মন ও মস্তিস্ককে আলোড়িত করছে।
রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, মা-বোনদের সম্ভ্রমহানীর বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা, দেশএবং লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি, সেই মাতৃরূপী দেশকে শত্রুমুক্ত রাখার অসীম সাহস ও শক্তি যোগাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সকল প্রকার অপশক্তি, অন্যায়, স্বাধীনতাবিরোধী, দুর্ণীতি, ধর্মান্ধতাকে রুখে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে যুগ যুগ ধরে সাহস ও শক্তি যোগাবে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন