ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১৯ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

সারা বাংলার খবর

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন তীব্র

জীবন চলছে অলিখিত নিয়মে

কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা : | প্রকাশের সময় : ৩ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম

আশি বছরের বৃদ্ধ সাধু জানেন না বাড়ি ভেঙে গেলে তিনি কোথায় আশ্রয় নিবেন। হতাশ ও সর্বশান্ত এই বৃদ্ধ বললেন, ‘বাপ-দাদার সয়-সম্পদ সউগ গেইছে। মনে করছিনু থাকমো এবছর। কই থাকপের পাই। পইসাও নাই কিদি জাগা নিমো। কারো বাড়িত ধাপড়ি তুলি থাকা নাগবে।’
তার অসহায় অবস্থার অভিব্যক্তি থেকে গোটা নদী ভাঙনকৃত পরিবারগুলোর আঁকুতি যেন ঝড়ে পরছিল। বাড়ির পাশে এই বৃদ্ধের তিন বিঘা অবশিষ্ট জমিও গত এক সপ্তাহে গিলে খেয়েছে প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ। কারো আশ্রয়, কারো খিদে মেটাবার পাকা ধানী জমি, প্রিয় গাছপালা এবং বাপদাদার কবরও রেখে যায়নি। কান্না চেপে রাখতে পারছিল না কেউই।

কলাতি পাড়া গ্রামের স্থানীয়রা জানান, হাতিয়া ইউনিয়নের উত্তরে পালেরঘাট এলাকার প্রফুল্ল পালের বাড়ি থেকে দক্ষিণে কলাতিপাড়া গ্রামের অপিজলের বাড়ি পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার ব্যাপী এলাকা জুড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে গত ৬ মাসে নীলকণ্ঠ গ্রামের ২৫৯টি বাড়িসহ গোটা গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এছাড়াও হাতিয়া বিল গ্রামের ৬০টি বাড়ি, রামখানার ১১টি বাড়ি, কলাতিপাড়ার ৭০টি বাড়িসহ মোট ৩৯০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।

ভাঙন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বিরুপ আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যে বাড়িঘর সরাচ্ছেন দক্ষিণের কলাতিপাড়া গ্রামের শেষ বাড়ির সদস্য দিনমজুর অপিজল। তিনি জানালেন, একদিকে করোনা অপরদিকে নদী ভাঙন। আমরা শ্যাষ হয়া গেলাম। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, বৃষ্টি আর করোনার কারণে প্রতিবেশি কেউ তাকে সহযোগিতা করছে না। ভাঙনের কারণে এরই মধ্যে ৭টি পরিবার খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। নদী কুড়ি হাত দূর থেকে উন্মত্ত হয়ে ধেয়ে আসছে বসতবাড়ির দিকে।

গত সোমবার সকালে সরেজমিনে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীরে বসবাসরত ভাঙন কবলিতদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের দুর্দশার কথা। এই ইউনিয়নের ১২শ’ মিটার এলাকা বাদ রেখে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে দুদিকে প্রায় ৫ কিলোমিটার ব্যাপী এলাকায় স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ কাজ অনুমোদন পেয়ে কাজ শুরু করেছে। মাঝখানে ১২শ’ মিটার এলাকা উন্মুক্ত রাখায় ওই এলাকার ৪টি গ্রামের শতশত মানুষকে সর্বশান্ত করে ফেলেছে। গত ৫ বছরে এই গ্রামগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বারবার নদী ভাঙনের ফলে নিঃস্ব^ হয়েছে পরিবারগুলো। এতে ২ হাজার একর জমি, দেড় হাজার পরিবার হারিয়ে তাদের সহায় সম্বল।

বারবার নদী ভাঙনের শিকার নিঃস্ব পরিবারগুলো তাহলে কিভাবে ঠাঁই নেয়, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল অলিখিত কিছু নিয়মের কথা। এলাকাবাসীরা জানালেন, বাড়ি ভেঙে গেলে স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রতি শতক জমি ৩ হাজার টাকায় চুক্তি করে ৫ বছরের জন্য লিজ নেয়া হয়। যাদের টাকা যেমন আছে তারা তেমনভাবে বাড়ির জন্য জমিতে থাকার অধিকার পায়। এই ৫ বছরে নদীতে বাড়ি ভেঙে গেলে টাকা ফেরত পাবে না। ভাঙনকবলিত সামর্থ অনুযায়ী ৫ শতক থেকে এক বিঘা পর্যন্ত জমি লিজ নিয়ে থাকে। এই ৫ বছরে কেউ সামর্থ হলে নিজেই জায়গা কিনে জমি ফেরত দিয়ে চলে যান।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীরে ইতিমধ্যে অনুমোদনকৃত প্রকল্প থেকে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার ব্যাপী স্থায়ী নদী সংরক্ষণ কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়ন এবং ভাটিতে চিলমারীর জোড়গাছ এলাকায় ১৭৫০ মিটার এলাকা গ্যাপ রয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত স্থায়ী নদী সংরক্ষণের কাজ শুরু করবো।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন