ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭, ১২ সফর ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

থমকে যাচ্ছে উন্নয়ন কাজ

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা-নির্লিপ্ততা

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৩ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিবীক্ষণ, সমাপ্ত প্রকল্পের গুণগত মূল্যায়ন এবং গণখাতে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করে দেশের আর্থ- সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর সহায়তা প্রদানের কাজ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ণ বিভাগের। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে আইএমইডি আরও পিছিয়ে দিচ্ছেন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে। নানা অজুহাতে দেশের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে নানা বিড়ম্বনা সৃষ্টি করছেন। উন্নয়ন কাজকে কার্যকর করতে সহায়তা করার দায়িত্ব থাকলেও বরং আরও পিছিয়ে দিচ্ছেন উন্নয়ন কাজ।
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সফল বাস্তবায়নে কাজ করে আইএমইডি। অথচ এডিপি বাস্তবায়নের হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থমন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিতর্ক চলছে। সরকারের দুই মন্ত্রণালয় দু ধরনের তথ্য দিচ্ছে। আর এর মূলে আইএমইডি’র অদক্ষতা। যদিও এনিয়ে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে বেশ কটি সুপারিশ করা হয়েছিল। সেগুলোর বেশির ভাগই অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে, সরকারের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পেই অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়। বর্তমানে বিষয়টি বেশ আলোচিতও। কেন অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়, তার কারণ খুঁজে বের করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিবদের নিয়ে বৈঠকে বসছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে বৈঠকে। এতে সভাপতিত্ব করবেন পরিকল্পনামন্ত্রী।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, বৈঠকের আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা, ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপির সুষ্ঠু ও গুণগতমানসম্পন্ন বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা, ডিপিপির গুণগতমান বিষয়ক আলোচনা-কেস স্টাডি এবং বিবিধ। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের সিনিয়র সচিব/সচিব/ভারপ্রাপ্ত সচিবদের ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্লিপ্ততার জন্য থমকে যাচ্ছে উন্নয়ন কাজের গতি। এর মধ্যে কয়েকটি মেগা প্রকল্পও রয়েছে। সামান্য অজুহাতে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আটকে দেয়াই যেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কাজ। কি করলে সমাধান মিলবে সে বিষয়ে তারা বরাবরই নীরব। ধরা যাক কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্পসারণ প্রকল্পের কথা। এই প্রকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে বিশাল জটিলতা তৈরী হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্ত হতে হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের বেশ কয়েকটি প্রকল্পও আটকে আছে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তিতে।
জানা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণসহ প্রধান বিমানবন্দরগুলোর উন্নয়নে গৃহিত প্রকল্পের কাজের গতি বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনভিজ্ঞতা এবং প্রকল্প প্রস্তবনা তৈরিতে অদক্ষতার কারণেই বিদ্যমান অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। যার ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে এবং ব্যয় বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর সংখ্যা কয়েকবছর ধরেই বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ এসব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংক্ষমতা সেতুলনায় বাড়েনি।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে একনেক কক্সবাজার রানওয়ে এক্সটেনশন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পে দেড় বছরেও কন্ট্রাক্টর নিয়োগ দেয়নি। মন্ত্রণালয় চীনের যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দ্বিতীয় দফায় যে এক হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব গত ২৮ জুলাই মন্ত্রীসভার জাতীয় ক্রয় কমিটির কাছে প্রস্তাব করেছিল কমিটি সেটি অনুমোদন দেয়নি। কারণ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ণ বিভাগ এই প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি চিহ্নিত করে আপত্তি দিয়েছে। এজন্য ক্রয় কমিটি এই প্রস্তাব আরও পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠায়।
গত ২৪ জুন মন্ত্রণালয় সিসিএনপি থেকে প্রথমবারের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কন্ট্রাক্টর নিয়োগের অনুমোদন পায়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি সিসিএনপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ এনে আইএমইডির কাছে টেন্ডার প্রক্রিয়া পর্যালোচনার অনুরোধ জানায়। এ প্রসঙ্গে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ বলেন, তারা টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ত্রুটি খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক। কিভাবে দ্রুত সেই ত্রুটি থেকে বেরিয়ে প্রকল্পকে গতিশীল করা যায় সে বিষয়টি কেউ ভাবে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছা থাকলে তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে এর সমাধানের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তারা সেটা করে না, বা করছে না।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, তারা এই ইস্যুতে এখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। সামগ্রিক বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের জন্য অপ্রত্যাশিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা বিগত ছয় মাস ধরে এই টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সব রকম নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যদি এই প্রকল্প পুনরায় টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণের সিদ্ধান্ত হয় তাহলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এক থেকে দুই বছর পিছিয়ে যাবে। তারা আরও দাবি করেছেন, কন্ট্রাক্টর নিয়োগে বিলম্বের কারণে দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণের এই প্রকল্প খরচ বেড়েছে।
২০১৭ সালের অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মান প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। সেসময় এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের নভেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মান প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই নির্মাণ ব্যয় ৬ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয় ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার এটি একটি উদাহরণ মাত্র। প্রথমে এই প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সাল পর্যন্ত। কিন্তু নতুন করে এটি বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২০২৫ সাল। মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পগুলোর খরচ ও সময় বাড়ানো এখন একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অপর প্রকল্প- যশোর বিমানবন্দর, সৈয়দপুর বিমানবন্দর এবং রাজশাহীর শাহ মাখদুম বিমানবন্দরের রানওয়ের ওপর পিচ ঢালা প্রকল্প গ্রহণ করা হয় দুই বছর আগে। কিন্তু সম্ভাব্য ৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন টাকার এই প্রকল্প এখনো পার পেতে পরিকল্পনা কমিশনকে অনেক বেগ পেতে হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক আশা প্রকাশ করেন যে, এই প্রকল্প দ্রুতই অনুমোদন পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের উচিত সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের উপর জোর দেয়া এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করা। শুধু প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি করে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ নেই বলে তিনি মনে করেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন