ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭, ১৩ সফর ১৪৪২ হিজরী

সাহিত্য

কবিতার কলকব্জা

আকিব শিকদার | প্রকাশের সময় : ২৮ নভেম্বর, ২০১৯, ৯:১৩ পিএম

কবিতা কী? অনেকের মতে, কবিতার কোনও সংজ্ঞা হয় না। তবু বলতে চাই, কবিতা হচ্ছে ছন্দ আশ্রিত বাক্যে অলংকার মিশ্রিত চিত্রকল্পে সাজানো এক বা একগুচ্ছ পংক্তিমালা।

একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটকে বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে রূপকধর্মীতা ও নান্দনিকতা সহযোগে কবিতা রচিত হয়। একজন কবি তাঁর রচিত ও সৃষ্ট মৌলিক কবিতাকে লিখিত বা অলিখিত উভয় ভাবেই প্রকাশ করতে পারেন।
হয় অনেক কিছু জড়িয়ে, না-হয় একটা কিছু ছড়িয়েÑ কবিরা সাধারণত এই দুই ধারায় লিখেন । কেউ তাঁর চারপাশের নানা বিষয় জড়ো করে থরে থরে সাজিয়ে লিখছেন, আবার কেউ হয়তো এক বা দুটো বিষয় নিয়ে লিখছেন তুমুল তুড়জোড়ে। তবে কবিতার ভালোমন্দ নির্ভর করে ভেতরবস্তু কতটা সুন্দর এবং উপস্থাপন কতটা সমৃদ্ধ তার ওপর।
অনেক কঠিন কথাও সহজ করে বলা যায়, কিন্তু অনেকেই সহজ কথাকে কঠিন করে বলতে অভ্যস্ত। ভাষার ওপর ভালো দখল ছাড়া মনের ভাব ভালোভাবে পরিস্ফুট হয় না; ফলে মনোমুগ্ধকর কবিতাও হয় না।
কেবল পংক্তিতে পংক্তিতে অন্ত্যমিল দিলে কিংবা গদ্যভাষায় আবেগ জড়িয়ে কবিতার আকারে সাজালেই তা কবিতা নয়। ভালো কবিতায় চিত্রকল্প, ছন্দ, অলংকার, পরিচ্ছন্ন ভাব বিন্ন্যস্ত থাকে, শিরায় প্রবাহিত রক্তের মতো এক ধরনের যোগসূত্রের সুর থাকে। কবি কল্পনার মিশেলে তাঁর কবিতায় শব্দমালা দিয়ে যে-সব ছবি আঁকেন সে-গুলোই হচ্ছে চিত্রকল্প। কারো কারো মতে, চিত্রকল্পই কবিতা। আবার অনেকে মনে করেন, এটি কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা থাকলে কবিতা জীবন্ত হয়ে উঠে এবং মানুষের মনে সহজেই দাগ কাটে। তবে কবিতার শ্রী বৃদ্ধি করতে গিয়ে উপমার মাত্রাতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি না করাই শ্রেয়।
শব্দ সাজাবার কৌশল মস্তিস্কসঞ্জাত। কিন্তু আবেগ হৃদয়জাত। কবিতা নির্মাণে হৃদয় ও মস্তিস্ক দুটোই কাজ করে বলে কবিতাকে বলা যায়, আবেগের বৌদ্ধিক প্রকাশ। কবিতা হলো মুখনিশৃত আওয়াজের বা শাব্দিক চিৎকারের লিখিত রুপ।
সব পদ্য যেমন কবিতা নয়, আবার সব কবিতাও পদ্য নয়। পদ্যের পরিচয় শুধু অন্ত্যমিলে। পদ্য তখনই কবিতা হয়ে ওঠে যখন তাতে ভাব, আবেগ, রস ও সৌন্দর্য উপস্তিত থাকে। সুচয়িত শব্দাবলীতে গঠিত ভাষা, অলঙ্কার, চিত্রকল্প- এসবের মিশ্রণে গড়ে ওঠে স্বার্থক কবিতা।
অনেকে মনে করে ছড়া আর কবিতা একই জিনিস। না। ছড়াতে সাধারণত গভীর ভাব থাকে না। ছড়াতে শিশুতোষ, সামাজিক, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বিষয়ের সরাসরি বক্তব্যই প্রকাশ পায়।
কখনো কখনো চিত্রকল্পের কারণে একটি কবিতাকে এক এক পাঠক এক এক ভাবে অনুভব করেন, আর সে অনুভব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কবির অনুভব থেকে ব্যতিক্রম হয়ে যায়। কবিতার দুর্বোধ্য রহস্য উদঘাটন করার বোদ্ধা পাঠক খুব নগন্য। কর্ম ব্যস্ত জীবনে মানুষ শান্তির জন্য নাটক গল্প, সংবাদ ইত্যাদি থেকে বিনোদন গ্রহণ করে, আধুনিক কবিতায় সে বিনোদন কম পাওয়া যায়। কবিদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক কবির সল্প সংখ্যক কবিতাই লেখার গতিময়তার কারণে পঠন উপভোগ্য হয়, আর বেশিরভাগের কবিতাকে মনে হয় কংক্রিটের আবরণে আটকে থাকা চিনা বাদাম। তার বাস্তবতা কবিতার জগতে কবিদের সংখ্যা যত বেশি পাঠকের সংখ্যা তাদের চেয়ে অনেক কম।
প্রযুক্তি পৃথিবীকে ছোট করেছে, বেড়েছে মানুষের কাজের পরিধি। মানুষ এখন অল্পের মাঝে অধিক কিছু প্রাপ্তির আশা করে। সেই বিবেচনায়, কবিতা আজকের যুগের মানুষের জন্য একটি উপযুক্ত প্রকরণ।
পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষই স্বকীয়, কারো সাথে অন্য কারোরই কোনোই সাদৃশ্য নেই। সাদৃশ্য নেই লৌকিকতায়, নেই আভ্যন্তরীনও। সেইহেতু- স্বতন্ত্র মন, সকল সফল কবিরই নিজস্বতা আছে, খুব সূক্ষ্ম হলেও আছে। আবেগদীপ্ত কবিমন ছাড়া কবি হওয়া যায় না। কবি সেই ব্যক্তি, যিনি কবিত্ব শক্তির অধিকারী এবং কবিতা রচনাকারী। সাধনার দীপ্রতার ওপর কবির কবিতার গুণাগুণ নির্ভর করে। লেখার পরিমাণ দিয়ে নয়, গুণগত দিকের নিরিখে প্রত্যেক লেখককে মূল্যায়ন করা হয়।
যে লেখা পাঠককে ভাবায় না বা কোন চিত্র কল্পনার চোখে ভেসে উঠে না, তাতে আর যাই থাক প্রাণ থাকে না। কবিতা কবির নিজ হৃদয়ের শিল্প, কিন্তু তা অন্য হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। আমার মনেহয় কবিতা সেটাই, যা মানুষের হৃদয়কে আকৃষ্ট করে। কবিতা হলো হৃদয়ের স্লোগান।
যে কবিতার অর্থ সেই কবি ছাড়া আর কেউ বুঝবেন না সেটাকে কবিতা বলতে আমার আপত্তি আছে। কবিতা কোনো বার্তা দেয় কি-না সেটাও দেখা উচিৎ। আমি মনেকরি, কবিতা থেকে তার অন্তর্নিহিত পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে পাঠককে গলদঘর্ম হতে হলে সেটি কবিতা নামের কলঙ্ক। কবিতাকে হতেহবে স্বচ্ছ, পাঠ করলেই যেন চোখের সামনে সব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
কবিতা হোক ষোড়শী নারীর মতো আকর্ষণীয়, তেজস্বী পুরুষের মতো যৌবনময়। কলম হোক পাঠক সৃষ্টির হাতিয়ার, পাঠক তাড়াবার নয়। কবির কলমই শান্তির অমিয় বাণী ঝরাবে, সমাজের অনাচার ও হিংসা দূর করবে, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমিত করবে এবং মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে বন্ধুত্ব ও সমঝোতা এনে দেবে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন