ঢাকা, বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

পেঁয়াজ ও লবণ আমদানি নয়

| প্রকাশের সময় : ৬ মার্চ, ২০২০, ১২:০৩ এএম

গত বছরের আগস্ট মাসে হঠাৎ করেই বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারত। এরপর পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে বাড়তে প্রতি কেজি আড়াইশ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পেঁয়াজ একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় নি¤œবিত্ত মানুষ পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে পড়ে। গত কয়েক মাস ধরে পেঁয়াজের মূল্য মানুষের আগ্রহের সংবাদ শিরোনাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেঁয়াজের ঘাটতি পুঁজি করে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর মূল্য কারসাজি এবং অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমূল্য দেখে দেশের কৃষকদের মধ্যে পেঁয়াজ চাষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার গত বছরের চেয়ে অন্তত ৪ লাখ টন উৎপাদন বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দেশে প্রায় ২৪ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ২০ লাখ টনের কাছাকাছি। সেই সাথে মওসুমের শুরু থেকেই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত থাকায় পেঁয়াজের বড় ধরনের ঘাটতির কোনো কারণ ছিল না। ভারতের হঠাৎ রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর জরুরী ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির পরও সারাদেশে বাড়তি দামে দেশি পেয়াঁজের বেচা-কেনা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, দেশে পেঁয়াজের বড় ধরনের ঘাটতি ছিল না। দেশে নতুন পেঁয়াজ উত্তোলন শুরু হওয়ায় পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। ভাল ফলন এবং বাড়তি জমিতে পেঁয়াজ চাষ হওয়ায় এবার দেশি পেঁয়াজ সারা বছরের চাহিদা পুরণে সক্ষম হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় ভারত পেঁয়াজ রফতানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং দেশের আমদানিকারকরা মার্চের মাঝামাঝি থেকে আবারো ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করতে যাচ্ছে বলে প্রকাশিত খবরে জানা যায়।

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান এখনো বহুলাংশে কৃষিনির্ভর। ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির উপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার যোগান দিতে দেশের কৃষকরা অসাধ্য সাধন করে চলেছে। কৃষকের ভাগ্য, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জীবনমানের উন্নয়ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ ও লাভসহ মূল্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ধানচাল, আলু, পেঁয়াজসহ সব ধরনের কৃষিপণ্যে কৃষকের মূল্যবঞ্চনার সাথে একশ্রেণীর আমদানিকারকের কারসাজি এবং ভারতীয় কৃষিপণ্যের অবাধ প্রবেশের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে ভারতীয় গরু রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত মোকাবেলায় দেশের খামারি ও চাষিরা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ভারতীয় গরু ছাড়াই বাংলাদেশ কোরবানির ঈদের চাহিদা পুরণসহ গরুর গোশতে স্বয়ংসম্পুর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে পোল্ট্রিশিল্প এবং মৎস্যখাতেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও মজুদ নিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত কৃষককে মূল্যবঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে পারে। পেঁয়াজের ভরা মওসুমে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির পথ উন্মুক্ত করে পেঁয়াজের মূল্যে ধস নামলে স্বাভাবিকভাবে কৃষক পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবে এবং ভবিষ্যতে পেঁয়াজ নিয়ে আরো বড় ধরনের কারসাজি ও মূল্যসন্ত্রাসের পথ উন্মুক্ত হবে। এ ধরনের বাস্তবতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।

গত নভেম্বরে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে যখন জনমনে অস্বস্তি ও ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছিল তখন একদিন হঠাৎ করেই লবণ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে লবণের মূল্য বেশ কয়েকগুণ বাড়িয়ে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা হয়। লবণে ঘাটতির ভিত্তিহীন গুজবে দামবৃদ্ধি এবং সংকটের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মূল্য কারসাজির অপচেষ্টা সরকারের ত্বরিৎ হস্তক্ষেপে ভন্ডুল হয়ে যায়। চাল ও পেঁয়াজের মত লবণও আমাদের খাদ্যাভাসে অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশে লবনের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে কোনো ঘাটতি না থাকলেও একদিকে লবণ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সব সময়ই সক্রিয় থাকে, যারা ভরা মওসুমে ভারত থেকে লবন আমদানি করে কৃষক পর্যায়ে লবনের মূল্যে ধস নামিয়ে লবণ চাষিদের লোকসানের মুখে ঠেলে দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই লবণ নিয়ে এ ধরনের অপতৎপরতা চলছে। চলতি মওসুমেও লবণের বাম্পার উৎপাদনের পরও ভারত থেকে লবণ আমদানির অনুমোদন দিয়ে লবণচাষিদের সর্বস্বান্ত করার অপরিনামদর্শি তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষকের মাঠে এবং মিলারদের কাছে লাখ লাখ টন লবণ মজুদ থাকার পরও লবণ আমদানির আত্মঘাতি তৎপরতা অব্যাহত আছে। ধানের মওসুমেও একই ধরনের সিন্ডিকেটেড তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বছরের অন্যান্য সময় যখন তখন মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কার্যত জিম্মি করে রাখা হলেও উৎপাদন মওসুমে কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। ধান-পেঁয়াজ- লবণের মত নিত্যপণ্য উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে এক প্রকার স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও ভরা মওসুমে অপ্রয়োজনীয় আমদানি এবং কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে অস্বাভাবিক মূল্য সন্ত্রাসের তৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সাথে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ধান, লবণ, পেঁয়াজ ও আলুচাষী এবং পোল্ট্রি খামারিদের রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন